প্রযুক্তি শিশুদের শেখার জগৎ উন্মুক্ত করার পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে তাদের জন্য বাড়িয়েছে ঝুঁকিও। বাড়ছে অনলাইন শোষণ, সাইবার গ্রুমিং, সেক্সটরশন, সাইবার বুলিংয়ের মতো অপরাধ। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমেই শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
মঙ্গলবার (২২ জুলাই) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে আয়োজিত "পর্নোগ্রাফিক সাইট নজরদারি ও ফিল্টারিং" বিষয়ে বিশেষ সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। “শিশুদের যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ গ্রহণ এবং শিশু ও কমিউনিটির ক্ষমতায়ন” শিরোনামে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে আইন ও সালিশ কেন্দ্রে (আসক)।
এতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), বাংলাদেশ ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সমিতি (আইএসপিএবি) ও সিভিল সোসাইটির সম্মিলিতভাবে এ সংলাপে অংশ নেয়। অনুষ্ঠানে পর্নোগ্রাফি সাইট নজরদারি ও ফিল্টারিং বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আসকের নির্বাহী পরিষদের সদস্য তাহমিনা রহমান।
পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা ও অনলাইন শিশু নির্যাতন
আলোচনায় বক্তারা জানান, শিশু ও কিশোরদের মধ্যে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, গেমিং ও চ্যাট অ্যাপগুলোর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এর সঙ্গে বাড়ছে অনলাইন শোষণ, সাইবার গ্রুমিং, সেক্সটরশন, সাইবার বুলিংয়ের মতো অপরাধ।
অনেকে পরিচয় গোপন রেখে শিশুদের সঙ্গে ইমোশনাল বন্ধন তৈরি করে, তারপর নানা কৌশলে ভিডিও আদান-প্রদান, অশালীন বার্তা ও পর্নোগ্রাফিক কনটেন্ট শেয়ারের মাধ্যমে যৌন নিপীড়নে জড়ায়। এ ধরণের হয়রানির ফলে অনেক সময় শিশু ও পরিবার সামাজিক চাপের কারণে আইনি সহায়তা নিতে সাহস পান না।
অনুষ্ঠানে বিটিআরসি ও আইএসপিএবির ভূমিকা নিয়ে বক্তারা বলেন, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেবল পরিবার নয়, বরং আইএসপি, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিটিআরসি ও আইএসপিএবির ভূমিকা তুলে ধরে বক্তারা বলেন, পর্নোগ্রাফিক সাইটের তালিকা প্রণয়ন করে তা ব্লক করতে হবে। কনটেন্ট ফিল্টারিং, ডিএনএস ব্লকিং, ফায়ারওয়াল ব্যবস্থার মাধ্যমে অশালীন কনটেন্ট রোধ করা। শিশুদের জন্য নিরাপদ ব্রাউজিং প্ল্যাটফর্ম চালু করা। নাগরিকদের জন্য সহজ রিপোর্টিং সিস্টেম তৈরি। আইন অনুযায়ী মনিটরিং ও অডিটিং ব্যবস্থা কার্যকর করা। সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু রাখতে হবে।
ঘর থেকেই শুরু হোক সচেতনতা
আলোচনায় বক্তারা আরও বলেন, প্রযুক্তি যেমন শিশুদের শেখার জগৎ উন্মুক্ত করেছে, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে তাদের জন্য ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমেই শিশুদের ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
সেক্সটিং, সাইবার বুলিং কিংবা অনলাইন গ্রুমিং থেকে শিশুদের রক্ষা করতে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার গুরুত্বও তুলে ধরেন বক্তারা।
সমন্বিত পদক্ষেপের আহ্বান
সংলাপের শেষাংশে বক্তারা বলেন, একটি সমন্বিত রোডম্যাপ প্রণয়ন করে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ, মনিটরিং ও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই গড়ে উঠতে পারে শিশুবান্ধব একটি নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ।
টেরে ডেস হোমস্ নেদারল্যান্ডসের (টিডিএইচ নেদারল্যান্ডস) সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটির সমন্বয় করেন আসকের উপদেষ্টা মাবরুক মোহাম্মদ। “শিশুদের যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ গ্রহণ এবং শিশু ও কমিউনিটির ক্ষমতায়ন” আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন- বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম মনিরুজ্জামান। এছাড়াও অতিথি হিসেবে ছিলেন- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতরের সিস্টেম এনালিস্ট মো. শরিফুল ইসলাম, মহিলা বিষয়ক অধিদফতরে নার্গিস সুলতানা জেবা, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) সহ-সভাপতি নেয়ামুল হক খান এবং টেরে দেস হোমস নেদারল্যান্ডসের কান্ট্রি ম্যানেজার নজরুল ইসলাম।
এছাড়াও শিশুদের সুরক্ষা ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন এনজিও ও সংগঠনের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানের অংশগ্রহণ করেন।