দেয়ালের ভাষায় ইতিহাস, স্মৃতি ও প্রতিরোধের চিত্রায়ণ

রাজধানীর আগারগাঁও থেকে কারওয়ান বাজার মেট্রোরেল পিলারের ওপর অঙ্কিত গ্রাফিতিতে ফুটে উঠেছে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক দমন-পীড়নের ভয়াবহ অধ্যায় এবং ২০২৪ সালের ৩৬ দিনের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নানা দৃশ্য—মিছিল, সংঘর্ষ, গ্রেফতার ও আত্মত্যাগ।

গুম, হত্যা, ভোট ডাকাতি, শিক্ষাব্যবস্থার ধ্বংস ও নাগরিক অধিকারের হরণ—এসব বাস্তবতার প্রতিবিম্ব যেন ফুটে উঠেছে রং ও রেখার প্রতিটি আঁচড়ে। শহিদ আবরার, ফেলানির মুখাবয়ব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, স্মৃতি কেবল আবেগ নয়—এটি রাজনৈতিক সংগ্রামের অস্ত্র।

এই গ্রাফিতি কার্যক্রমকে বিশ্বব্যাপী জনগণের প্রতিরোধশিল্পের ধারাবাহিকতায় একটি আধুনিক সংযোজন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। দক্ষিণ আমেরিকার স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন, ফিলিস্তিনের দেওয়ালে প্রতিবাদচিত্র, যুক্তরাষ্ট্রে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার, কিংবা মায়ানমারে জান্তা-বিরোধী বিক্ষোভের মতো—এই দেয়ালচিত্রও হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের জনগণের প্রতিরোধের প্রতীক।

শুক্রবার (১ আগস্ট) ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সহযোগিতায় রাজধানীর আগারগাঁও মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে “জুলাই আর্ট ওয়ার্ক” অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এসব চিত্র তুলে ধরা হয়। 

‘দেয়ালের ভাষা: স্মৃতি, প্রতিরোধ ও জনতার ইতিহাস’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে অঙ্কিত জুলাই আর্ট ওয়ার্কে ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের চিত্রমালা উপস্থাপন করা হয়েছে। 

এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং সভাপতিত্ব করেন ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপদেষ্টা বলেন, এই গ্রাফিতিগুলো আমাদের আওয়ামী স্বৈরশাসনের ভয়াল দিনগুলো এবং জনগণের সাহসী প্রতিরোধের ইতিহাস বারবার স্মরণ করিয়ে দেবে। ভবিষ্যতে এ দেশে যেন আর কোনও স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে লক্ষে এসব গ্রাফিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সভাপতির বক্তব্যে ডিএনসিসি প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ ইস্যুতে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার বিষয়টি মাথায় রেখেই এই গ্রাফিতি কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। গত ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের উত্থান এবং তার পতনের ইতিহাস তুলে ধরাই ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। গত একবছরে অনেক রং ফিকে হয়ে গেলেও, জুলাইয়ের চেতনা আজও অমলিন।’

উল্লেখ্য, ঢাকার মেট্রোরেল পিলারগুলো এতদিন ছিল উন্নয়নের প্রতীক; আজ তা হয়ে উঠেছে বিকল্প ইতিহাসের ক্যানভাস। ছাত্রজনতা ও নাগরিক সমাজ নিজেদের শিল্পী, লেখক ও ইতিহাস-নির্মাতা হিসেবে প্রকাশ করেছে এই দেয়ালে। এটি কেবল গ্রাফিতির প্রদর্শনী নয়—একটি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং নান্দনিক আন্দোলনের প্রামাণ্য দলিল।