মানবাধিকার সুরক্ষাই হতে হবে তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ সংস্কারের মূল চালিকা শক্তি: আর্টিকেল ১৯

ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা মানবাধিকার রক্ষার জন্য অপরিহার্য, একইসঙ্গে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে এবং উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার জন্যও তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যখন একটি তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ প্রণয়নের কথা ভাবছে, তখন এটি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি যেন প্রস্তাবিত কাঠামোটি সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিকে সহজ করে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ভিত্তিতে প্রণীত হয়।

সোমবার (২৫ আগস্ট) এক বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল ১৯ এই আহ্বান জানায়।

বিবৃতিতে বলা হয়, খসড়া প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, অর্ডিন্যান্সের কিছু নির্দিষ্ট ধারা যদি সংশোধন করা না হয়, তবে তা গোপনীয়তার অধিকারকে ক্ষুণ্ন এবং দেশের সীমানার বাইরে তথ্য প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। পাশাপাশি এটি সরকার ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অসামঞ্জস্যপূর্ণ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে।

অধ্যাদেশটি যেন নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরকে সহজ করে, তা নিশ্চিত করার জন্য আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে অবশ্যই একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার দ্বারা পরিচালনা করতে হবে।

বিবৃতিতে তারা, ব্যক্তি অধিকার সংরক্ষণ এবং দায়িত্বশীল তথ্যভিত্তিক উদ্ভাবন ও ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য অত্যাবশ্যক সেই নির্দেশনাগুলো তুলে ধরেন। এর উদ্দেশ্য বর্তমান খসড়ার বিরোধিতা করা নয় বরং এটি নিশ্চিত করা যে চূড়ান্ত অধ্যাদেশটি মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে প্রণীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দায়বদ্ধ ও ভবিষ্যৎ উপযোগী হবে।

সংস্থাটি জোরালোভাবে আহ্বান জানায়, যেন বাংলাদেশ তথ্য সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের ভিত্তির ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অধ্যাদেশটিতে গোপনীয়তার অধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং তথ্যপ্রাপ্তির অধিকারের প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে-স্বেচ্ছাচারী বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ নজরদারি প্রতিরোধে দৃঢ় আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং যেকোনও অধিকারের ওপর আরোপিত সীমাবদ্ধতা আইনসম্মত, অপরিহার্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে তা নিশ্চিত করা, ‘জনস্বার্থ’ এবং ‘কার্যকরী প্রয়োজনীয়তা’ প্রভৃতি অস্পষ্ট বা অতিরিক্ত বিস্তৃত পরিভাষাগুলোকে স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা, যাতে সেগুলো হস্তক্ষেপমূলক বা বৈষম্যমূলক তথ্য প্রক্রিয়াকরণের যৌক্তিকতা প্রদানের অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত না হয়, তথ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, যার মধ্যে নিরাপদ কার্যকাল, আর্থিক স্বায়ত্তশাসন এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত থাকার নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত থাকবে, বিশেষত প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে, কোনও প্রকার শাস্তি ছাড়াই স্বাধীনভাবে প্রদত্ত এবং প্রত্যাহারযোগ্য সম্মতির অধিকার সংরক্ষণ করা, যেসব ব্যক্তির অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, তাদের জন্য সহজলভ্য, সময়োপযোগী ও কার্যকর প্রক্রিয়াগত সুরক্ষা ও প্রতিকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ব্যতিক্রমগুলো, বিশেষত আইন প্রয়োগ ও জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কিত ক্ষেত্রগুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা এবং সেগুলোকে স্বাধীন বিচারিক বা সংসদীয় তত্ত্বাবধানের আওতায় আনা। সব তথ্য ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়ায় মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারকে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা এবং এটি নিশ্চিত করা যে তথ্য সুরক্ষাকে কখনোই সাংবাদিকতা, জনসমালোচনা বা নাগরিক সমাজের পক্ষসমর্থন দমনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে না- এমন অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে নাগরিক সমাজ, কারিগরি বিশেষজ্ঞ এবং ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়গুলো সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত থাকবে, যাতে তথ্য সুরক্ষা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে সেটি নির্ধারণে তারা ভূমিকা রাখতে পারে।

বিবৃতিতে তারা আরও জানান, বাংলাদেশ সরকারকে এমন একটি সত্যিকার অধিকারসম্মত তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সমুন্নত রাখবে, ব্যক্তিকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করবে এবং সবার জন্য উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি ডিজিটাল পরিবেশকে নিশ্চিত করবে।