১১ বছরেও শুরু হয়নি উপস্থাপক ফারুকী হত্যার বিচার

১১ বছর আগে আজকের এই দিনে নিজ বাসায় খুন হন ইসলামিক অনুষ্ঠানের জনপ্রিয় উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী। হত্যার  ঘটনায় নিহতের ছেলে ফয়সাল ফারুকী বাদী হয়ে  রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই ঘটনায় ১১ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত এ মামলার বিচার শুরু হয়নি। ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছেন ফারুকীর পরিবার। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, খুব শিগগিরই এ মামলার বিচার শুরু হবে।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট রাত ৯টার দিকে রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজারের বাসায় মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ওই রাতেই তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরের দিন তার ছেলে ফয়সাল ফারুকী শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ ১০ বছর পর ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার কে এম আবুল কাশেম আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এতে পূর্ণাঙ্গ নাম ঠিকানা, সাক্ষ্য না পাওয়ায় আসামির তালিকা থেকে ছয় জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। অব্যাহতির সুপারিশ প্রাপ্তরা হলেন— জামাই ফারুক, নাঈম, ইমন, হাফেজ কবির, আশফাক ই আজমদ ও খোরশেদ আলম। আর ছয় জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অভিযোগপত্রে থাকা ছয় আসামির মধ্য বর্তমানে দুই আসামি পলাতক রয়েছে। গত ২৯ জুলাই আসামিদের আদালতে হাজির  হতে দুটি জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন আদালত। আগামী ১ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

মামলার অভিযুক্ত আসামিরা হলেন— হাদিসুর রহমান ওরফে সাগর ওরফে জুলফিকার ওরফে সাদ বিন আবু ওয়াক্কাস ওরফে আবু আল বাঙ্গালী ওরফে আব্দুল্লাহ স্যার ওরফে তৌফিক আমজাদ, আব্দুল্লাহ আল তাসনিম নাহিদ , রফিকুল ইসলাম ফারদীন ওরফে রুবেল ,আবু রায়হান মাহমুদ আব্দুল হাদী, মাহমুদ ইবনে বাশার, রতন চৌধুরী ওরফে ইঞ্জিনিয়ার রিপন ওরফে রাকিবুল ইসলাম রিয়াজ। এর মধ্যে আসামি মাহমুদ ইবনে বাশার ও রফিকুল ইসলাম ওরফে রুবেল পলাতক। আসামি হাসিদুর রহমান কারাগারে রয়েছেন। এছাড়া অপর তিন আসামি জামিনে রয়েছেন।

বাবা হত্যার বিচারে দীর্ঘসূত্রতায় আক্ষেপ প্রকাশ  এবং ন্যায়বিচারের আশার কথা জানিয়ে ফয়সাল ফারুকী বলেন,  একটি হত্যার ঘটনায় ১১ বছর তো পার হয়ে গেলো। অথচ বিগত সরকার খুনিদের ব্যাপারে কোনও কিছুই করতে পারেনি। এ সরকার প্রায় এক বছর আগে চার্জশিট দিয়েছে। কিন্তু সেটা এখনও আদালত গ্রহণ করেনি।

তিনি বলেন, অনেক সময় গেছে। এরপরও আমরা ন্যায়বিচার চাই। আমাদের পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছে। বিচার না পাওয়ায় আমরা পরিবারের সবাই মর্মাহত। বর্তমান সরকারে যারা আছেন, তাদের কাছে বিচারে হস্তক্ষেপ কামনা করছি। তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত আসামিরা পলাতক রয়েছেন। তাদের গ্রেফতারের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিচার কাজ সম্পন্ন করা হোক। তার হত্যার পেছনে যারা কলকাঠি নেড়েছে, তাদের সর্বোচ্চ সাজার দাবি জানান তিনি।

ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগের সরকার কিছুই করেনি। বেশির ভাগ কাজ বর্তমান সরকার করেছে। মামলাটির দীর্ঘদিন পরে চার্জশিট দাখিল করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। চার্জশিট দাখিল হলেও সেটা যাচাই-বাছাইসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া থাকে। বিচার শুরু হওয়ার জন্য আর মাত্র কয়েকটি ধাপ বাকি রয়েছে। আশা করি, খুব শিগগিরই মামলাটির বিচার শুরু হবে এবং নিহতের পরিবার ন্যায় বিচার পাবে।

আসামিদের পক্ষের রিপনের আইনজীবী মো. জাইদুর রহমান জানান, এ মামলার বিচারের দেরি হওয়ায় অভিযুক্তরাও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর এখনও বিচার শুরু হয়নি। এগুলো সরকারের ভালোভাবে দেখা উচিত।

মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টার দিকে নুরুল ইসলাম ফারুকীর বাসায় কলিং বেল চাপ দেয় দুর্বৃত্তরা। বাসার দরজা খুললে দুই জন লোক বাসায় প্রবেশ করে নুরুল ইসলামের সাথে ড্রয়িং রুমে বসে। এর কিছুক্ষণ পর আরও ৬/৭ লোক বাসায় প্রবেশ করে। বসার স্থান সংকুলান না হওয়ায় ফয়সাল ফারুকীর মামাতো ভাই মারুফ হোসেন ভেতর থেকে চেয়ার আনতে যান। তিনি ফিরে এসে দেখেন, নুরুল ইসলামের মাথায় পিস্তল ও চাপাতি ধরে রেখেছে আসামিরা। পরে তারা বাসার সবাইকে বেঁধে ফেলে নুরুল ইসলাম ফারুকীকে কুপিয়ে হত্যা করে। আসামিরা বাসা থেকে নগদ টাকা, মোবাইল, স্বর্ণালঙ্কার, ক্যামেরা নিয়ে যায়।

নিহত ফারুকী চ্যানেল আইয়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘কাফেলা’ ও ‘শান্তির পথে’, মাই টিভির লাইভ অনুষ্ঠান ‘সত্যের সন্ধানে’র উপস্থাপক ছিলেন। এছাড়া, তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পাদক, সুপ্রিম কোর্ট জামে মসজিদের খতিব ছিলেন।