গুম দিবসের বৈঠকে বক্তারা

সব গুম কারাগারকে হেফাজতে নিতে হবে

সব গুম কারাগারকে হেফাজতে নিতে হবে। এগুলো কারা দেখাশোনা করছে, এগুলো কেন এখনও কমিশন হেফাজতে নেওয়া হয়নি। কেবল রেপ্লিকা নয়, প্রকৃত আয়না ঘরগুলোকে হেফাজত করতে হবে। সেই কারাগারগুলো এখন কী অবস্থায় আছে, সেখানে যে প্রমাণ ছিল তা নষ্ট করা হচ্ছে কিনা জানতে হবে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, গোপন কারাগারগুলো নিয়ে অসহযোগিতার কথা আমরা গুম কমিশনের কাছ থেকে শুনেছি, কারাগারগুলোকে সুরক্ষা দিতে পারা যায়নি। এখনও অসহযোগিতা করা কনটিনিউয়াস ক্রাইমের অংশ। 

শনিবার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে গুম দিবস উপলক্ষে আয়োজিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। “জবাবদিহিতার পথে: গুমের শিকারদের জন্য আন্তর্জাতিক দিবসের স্মরণে” শিরোনামে গোলটেবিল বৈঠকটি যৌথভাবে আয়োজন করে গুমের ঘটনা বিষয়ক অনুসন্ধান কমিশন এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়। 

গুমের শিকার মাইকেল চাকমা আলোচনায় বলেন, আপনাদের ওপর যে ক্ষমতা দেওয়া আছে, সে ক্ষমতা যদি আপনি পালন না করতে পারেন। আমি ভিকটিমের জায়গা থেকে কী বলবো। গুমের সঙ্গে কারা জড়িত ছিল তা যদি আপনারা এক্সপোজ করতে না পারেন, আমরা কার কাছ থেকে কী আশা করবো। সেটা হচ্ছে আমার উদ্বেগের জায়গা। যেসমস্ত বাহিনী, সংস্থা জাগিত ছিলেন তাদের জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসা দরকার, যেসব সামরিক কর্মকর্তারা জড়িত ছিলেন তাদের চিহ্নিত করা। এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। 

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা, সেতো ফ্যাসিস্ট। তার রেজিমে যা যা করেছিল, তার সঙ্গে বড় একটা গ্রুপ ছিল। আয়নাঘর কারা পরিচালিত করেছিল। তাদের চিহ্নিত করতে হবে। তাদের কে নির্দেশ দিয়েছে, তা আমাদের জানতে হবে। এসব যদি না বের করতে পারি তাহলে গুমের যে সংস্কৃতির কথা আমরা বলছি এটা তো আর ভবিষ্যতে বন্ধ হওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে না। শেখ হাসিনা চলে গেছে, নেক্সট যে হাসিনার মতো কেউ আসবে না, এমন নিশ্চয়তা দিতে পারি না। আরেকটা বিষয় হলো, জবাবদিহিতার আওতায় শুধু ওই সমস্ত ব্যক্তিকে আনলে হবে না। রাষ্ট্রকে আনতে হবে। রাষ্ট্র এখানে সম্পৃক্ত। ক্ষমা চাওয়া, ভিকটিমদের যে ক্ষতি হয়েছে—তা স্বীকার করার বিষয় আছে। 

অনুষ্ঠানে উপদেষ্টা আদিলুর রহমান বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত গুমের ভিকটিমরা ফেরত না আসেন, ততক্ষণ পর্যন্ত গুমের বিষয়টা চলমান। মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু সমস্ত প্রমাণ থাকার পরেও বাধা থাকে, যে বাধার সঙ্গে সংগ্রাম করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমাদের গুম কমিশন অসাধারণ কাজ করেছে। রিপোর্টেই সব শেষ হবে না, নাগরিক সমাজের কাজ থাকবে এর পরেও। 

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আমরা অনেকেই তার অবস্থার স্বাদ গ্রহণ করেছি। বিচার প্রক্রিয়াকে দাঁড় করানো, বিচারগুলো করা, প্রকৃত আয়না ঘরগুলোকে যদি আমরা রক্ষা করতে পারি—তাহলেও এটা ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। যদি রক্ষা করতে না পারি, শুধু রেপ্লিকাতে কাজ হবে না। 

উপদেষ্টা আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রাম করেছে। এবারের সাড়ে ১৫ বছরের লড়াইটা ছিল অনেক দীর্ঘ এবং ভয়াবহ। এর পরিণতি ৩৬ দিনে আসলেও এর পিছনের ইতিহাস অনেক লম্বা। হাজার হাজার মানুষের রক্ত এবং তাদের নির্যাতনের ইতিহাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে আজকের বাংলাদেশ। আমি বিশ্বাস করি ওএইচসিআর এর ঢাকা যে মিশন, গুম কমিশনের যৌথ উদ্যোগে আমাদের বাংলাদেশের মানুষকে যারা নির্যাতন, গুম ও বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিলেন—তাদের বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে একটা পথ দেখিয়ে দিয়ে যাবেন। আরও ট্রাইব্যুনালে প্রয়োজন আছে কিনা চিফ প্রসিকিউটর সেটি ভাবতে পারেন বলেও উল্লেখ করেন উপদেষ্টা। 

আলোচনায় মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, আগে ৩০ আগস্ট এই দিবস পালন করতে দেওয়া হতো না। আমাদের বলা হতো রাষ্ট্রদ্রোহী। যারা গুম থেকে ফিরে এসেছেন, তাদের কাছ থেকে আমরা আন্দাজ করতাম কী করা হতো। কিন্তু ভয়াবহতার জায়গাগুলো বের করে আনার জন্য কমিশনকে ধন্যবাদ জানাতে হয়। আমরা যারা ভিকটিম পরিবার তাদের আকাঙ্ক্ষা বেশি। আমরা বিগত এক যুগের বেশি সময় স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারিনি। প্রতিনিয়ত আমাদের দিকে আঙুল তোলা হতো, আমাদের পযবেক্ষণে রাখা হতো। কমিশন একটা টার্গেট নিয়ে কাজ করছেন কিন্তু আমাদের যে পরিমাণ ভিকটিম পরিবার তারা সমানভাবে আশা করে তাদের প্রত্যেকের বিষয়গুলো বেরিয়ে আসুক। সত্যটা জানান জন্য প্রত্যেক পরিবারের অধিকার আছে। কমিশনের রিপোর্টগুলো ভিকটিম পরিবারগুলোর সঙ্গে শেয়ার করা যায় কিনা সে বিষয়টিও উল্লেখ করেন তিনি। 

তিনি বলেন, আয়না ঘরগুলোকে যে ভেঙে ফেলা হয়েছে, এটাতো আজ পর্যন্ত কনটিনিউয়াস ক্রাইম। সাড়ে ৩০০ বেশি যারা গুম হয়ে এখনও ফেরত আসেনি তাদের পরিবারকে জানানোর ব্যবস্থা করা হোক—তাদের স্বজনদের কোন বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে।