আমলাতন্ত্রের একাংশের কাছে অন্তর্বর্তী সরকার নতি স্বীকার করেছে বলে দাবি করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলছে, নজিরবিহীন ত্যাগের বিনিময়ে কর্তৃত্ববাদী চোরতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের যে অভীষ্ট লক্ষ্য সূচিত হয়েছিল তা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত বিভিন্ন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম ‘সংস্কার বিমুখতা’ ও ‘আমলাতান্ত্রিক আধিপত্যের’ ফলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। অংশীজনদের সম্পৃক্ত না করে একতরফা অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে।
সোমবার (১১ জানুয়ারি) ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ প্রণয়নে সংস্কার বিমুখতা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলে টিআইবি। সংবাদ সম্মেলনে পর্যালোচনাটি উপস্থাপন করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
আওয়ামী লীগের পতনের পর তৈরি হওয়া অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিশন গঠন করে। পাশাপাশি বিভিন্ন অধ্যাদেশ জারি করে। আজকের সংবাদ সম্মেলনে সরকারের গৃহীত দুদক, পুলিশ কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, সাইবার সুরক্ষা, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশের ওপর টিআইবির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১১টি সংস্কার কমিশন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, একাধিক শ্বেতপত্র কমিটি, বেশ কয়েকটি সংস্কার কমিটি এবং গুম সংক্রান্ত কমিশন গঠনের পাশাপাশি জুলাই অভ্যুত্থানকালে কর্তৃত্ববাদী সরকার দ্বারা পরিচালিত হত্যাকাণ্ডসহ ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় তদন্তের জন্য জাতিসংঘকে আহ্বান জানানোর মতো ইতিবাচক পদক্ষেপ দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও সরকার সার্বিকভাবে সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত স্বচ্ছতা ও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের সূচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
সংস্কারের প্রশ্নে আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী মহলের অপশক্তির কাছে সরকারের নতি স্বীকার করেছে উল্লেখ করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার প্রতিরোধক মহলকে প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই অপশক্তির কাছে আত্মসমর্পণের ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাতিল এবং সংস্কার পরিপন্থি অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এমনকি জুলাই সনদকে যুক্তিহীনভাবে লঙ্ঘন করে নেতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি করা হয়েছে, যা পরবর্তী সরকারেরও অনুসরণ করার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে আমলাতন্ত্রের একাংশের অন্তর্ঘাতমূলক অপশক্তির কাছে সরকারের নতি স্বীকারের ফলে সংস্কার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।”
দুদক সংস্কার কমিশন প্রণীত সুপারিশমালাকে সরকার বা দুদক প্রত্যাশিত গুরুত্ব দেয়নি উল্লেখ করে টিআইবির পরিচালক বলেন, “দুদকের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুপারিশ উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। যদিও এক্ষেত্রে দুদকের শীর্ষ কর্তৃপক্ষের কোনও দ্বিমত ছিল না। তেমনি জুলাই সনদ অনুযায়ী প্রায় সকল রাজনৈতিক দলেরও নোট অফ ডিসেন্টবিহীন সম্মতি ছিল, যা সরকার বা দুদক কারোরই অজানা ছিল না। দুদকের অধিকতর সক্রিয়তার ফলে আমলাতান্ত্রিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দুর্নীতি নিয়ন্ত্রিত হবে, এটা যারা চান না তারাই মূলত সংস্কারটির বিরোধিতা করেছেন।”
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি থেকে আরও বলা হয়, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, নারী বিষয়ক, শ্রম ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর শ্বেতপত্রের সুপারিশ নিয়ে বাস্তবে কোনও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। সংস্কারের জন্য প্রতিষ্ঠান নির্ধারণে কোনও সুনির্দিষ্ট কৌশল ছাড়াই শিক্ষা ও কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে।