২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর। সেদিন রাতে হাফেজ কামরুল হাসান বন্ধুদের সঙ্গে সাজেকে যাওয়ার জন্য রায়েরবাগ বাসস্ট্যান্ড থেকে সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশে রওনা করেন। রাত আনুমানিক ৮টা ৪০ মিনিটে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের সায়েদাবাদ এলাকায় নেমে বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার জন্য ফ্লাইওভার দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন তিনি। সাথী আবাসিক হোটেল বরাবর পৌঁছালে কয়েকজন ছিনতাইকারী কামরুলের গতিরোধ করে। ছিনতাইকারীরা দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তার কাছে থাকা নগদ অর্থ ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতে চায়। এতে বাধা দেয় কামরুল। শুরু হয় ছিনতাইকারীদের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি। একপর্যায়ে ছিনতাইকারীরা ধারালো চাকু দিয়ে কামরুলের বুকে আঘাত করে। তখন ভুক্তভোগী কামরুল ফ্লাইওভারের ওপর লুটিয়ে পড়ে। পরে কামরুলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচতে পারেনি এই হাফেজ।
একই ধরণের ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের ১০ জুলাই। সেদিন টঙ্গী ফ্লাইওভারে ছিনতাইকারীদের হামলায় প্রাণ হারান কলেজছাত্র মাহফুজুর। আর গত ৬ ডিসেম্বর টঙ্গী ফ্লাইওভার উঠার সিঁড়িতে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে সিদ্দিকুর রহমান (৫৭) নামে এক ব্যক্তি প্রাণ হারান। কেরানীগঞ্জের কর্মস্থলে যাওয়ার সময় ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন তিনি।
কামরুল, মাহফুজুর ও সিদ্দিকুরের মতো অনেকে রাজধানীর বিভিন্ন ফ্লাইওভারে ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। আহতও হয়েছেন অনেকে। আর ছিনতাইয়ের ঘটনা অহরহ।
যানজট নিরসন ও নগরবাসীর দ্রুত যাতায়াতের সুবিধার্থে গড়ে উঠা ফ্লাইওভারগুলো এখন অপরাধীদের আখড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার অভাবে কাঙ্ক্ষিত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে নগরবাসী। যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাব ও ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় রাত নামলেই ফ্লাইওভার ঘিরে সক্রিয় হয়ে ওঠে বিভিন্ন অপরাধী চক্র।
ফ্লাইওভার ব্যবহারকারী চালক-যাত্রীরা বলছেন, ফ্লাইওভারগুলোতে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ছাড়াও ছিনতাইয়ের ঘটনায় নিরাপদে যাতায়াতে সব সময় আতঙ্কে থাকেন তারা। বিষয়টি স্বীকার করে পুলিশ বলছে, ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক অপরাধ কমাতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নিয়মিত টহল বাড়ানো হয়েছে।
নগরবাসীর সুবিধার্থে রাজধানীতে ছয়টি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হয়েছে। সেগুলো হলো, মহাখালী ফ্লাইওভার, খিলগাঁও ফ্লাইওভার, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার, কুড়িল ফ্লাইওভার, টঙ্গী ফ্লাইওভার ও মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভার। অব্যবস্থাপনা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ফ্লাইওভারগুলো ঘিরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অপরাধীরা। এর মধ্যে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে যান চলাচল বেশি থাকায় তুলনামূলক কম দুর্ঘটনা ঘটে। তবে, যানজটে গাড়ি থামলে ছিনতাইয়ের কবলে পড়ে অনেকে। নির্জনতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ছিনতাই, ডাকাতি ও মাদকসেবনে সক্রিয় রয়েছে নানা অপরাধী।
এছাড়া ফ্লাইওভারের নিচেসহ আশপাশ ও রেললাইন ঘিরে থাকা ভাসমান ছিন্নমূল কিশোর ও লোকজনদের অধিকাংশই মাদক সেবন এবং ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িত। এসব অপরাধীরা যাতায়াতকারীদের টার্গেট করে মোবাইলফোনসহ মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেয়।
ফ্লাইওভারের পিলারের উপরে থাকা ফাঁকা স্থানও ছিন্নমূল ও ভবঘুরেদের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিণত হয়েছে। এসব ফাঁকা স্থানে অবস্থান নিয়ে ছিনতাই করার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করেছে পুলিশ। গত বছরের অক্টোবরে মহাখালী ফ্লাইওভারের ফাঁকা অংশে গোপন আস্তানা গড়ে তোলা ছিনতাইকারীদের সন্ধান পায় পুলিশ। ছিনতাইকারীরা ফ্লাইওভার দিয়ে যাতায়াতকারী লোকজনদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র ছিনতাই করে ওই ফাঁকা অংশে লুকিয়ে থাকতো। একদল তরুণের সহায়তায় সেই অংশের সন্ধান পায় পুলিশ। গ্রেফতার করা হয় একজন ছিনতাইকারীকে। মোৗচাক-মগবাজার ফ্লাইওভারের ফাঁকা স্থানে থেকেও অপরাধী গ্রেফতারের ঘটনাও রয়েছে।
বিমানবন্দর পুলিশ বক্সের ইনচার্জ এস এম আব্দুল গফুর বলেন, “ঢাকা বিমানবন্দর থানার গোলচত্বর এলাকাটা অপরাধ প্রবণ। শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে চোর-ছিনতাইকারী ও টানাপার্টির সদস্যরা সেখানে গিয়ে অবস্থান নেয়। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর ও পাশে থাকে রেলস্টেশনের কারণে প্রচুর লোকজন আসা-যাওয়া করে। আর এই সুযোগটি কাজে লাগায় অপরাধীরা। প্রতিনিয়ত অভিযান চালিয়ে এসব অপরাধ চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়।”
গত কয়েকদিন রাত ১ থেকে ২টা পর্যন্ত ফ্লাইওভারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, দুটি ফ্লাইওভারে পুলিশি টহল। আর অন্যগুলোতে চোখে পড়েনি। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারে দায়িত্ব পালন করছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। মৌচাক-মগবাজার ফ্লাইওভারের রাজারবাগ ও কাওরানবাজার অংশ আলোহীন। এছাড়া আলোহীন দেখা গেছে ইস্কাটন থেকে উঠা ফ্লাইওভারের কিছু অংশ। খিলগাঁও ফ্লাইওভারের শাহজাহানপুর লুপে বেশ কয়েকজন তরুণ ও কিশোরকে আড্ডা দিতে দেখা যায়। গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের সায়েদাবাদ অংশে নামার পথে দু’পাশের রেলিংয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডা দিতে দেখা যায় বাসস্ট্যান্ডকেন্দ্রিক পরিবহণ শ্রমিক ও ভাসমানদের। এ পথে যাতায়াতকারী মামুন নামের একজন বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, “রাতে অনেককে ছোট ছোট গ্রুপে আড্ডা দিতে দেখা যায়। বাইক নিয়ে নিচে নামার সময় বাইকের সামনে হাত বাড়িয়ে থামানোর চেষ্টা করে।”
এদিকে, ফ্লাইওভারের নিচের জায়গা দখল করেও গড়ে উঠেছে বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনা। এসব স্থাপনা ঘিরেও সক্রিয় রয়েছে একাধিক অপরাধী চক্র। মগবাজার ফ্লাইওভারের নিচের জায়গা দখল করে দোকান, অবৈধ পার্কিং ও মাছের হাট বসিয়ে চলছে সিন্ডিকেট বাণিজ্য। রাজারবাগ স্কুলের সামনে গড়ে তোলা হয়েছে লেগুনাস্ট্যান্ড ও মোটরসাইকেলের পার্কিং। এছাড়া সিরাজুল ইসলাম মেডিকেলের সামনে থেকে মৌচাক মার্কেট পর্যন্ত রয়েছে গাড়ির পার্কিং।
শান্তিনগরের কর্ণফুলী মার্কেটের সামনে, কাওরান বাজার ও ইস্কাটনের ইউটার্ন এবং চৌধুরীপাড়ায় ট্রাফিক সিগন্যালের কারণে এই তিন অংশে প্রায়ই যানজট লেগে থাকে। নিউ ইস্কাটনের সড়ক ও ফুটপাথ অনেকটাই গাড়ি ব্যবসায়ীদের দখলে। মগবাজার থেকে বাংলামোটর ফ্লাইওভারের নিচে অস্থায়ী গাড়ির গ্যারেজ বানানো হয়েছে। অনেক জায়গায় ভাসমানরা আবাসন গেড়েছে। গভীর রাতে এসব খুপরি ঘরে বসে চলে মাদকসেবন ও বিক্রি। বিভিন্ন সময় পুলিশ অভিযান চালিয়ে ভাসমানদের পাশাপাশি এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে। তবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চলে যাওয়ার ফের দখল হয় ফ্লাইওভারের নিচের অংশ।
ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও গোয়েন্দারা সর্বদা তৎপর রয়েছে। ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে টহল বাড়ানো হয়েছে।”