‘আমার সন্তান মারা গেছে, এই সিচ্যুয়েশনে এসে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া যায়’, আদালতকে মা

রাজধানীর মালিবাগের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের অবহেলায় শিশু আহনাফ তাহমিন আইহামের (১০) মৃত্যুর মামলায় মা খায়রুন নাহারের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে। সাক্ষ্যে যাদের কারণে ছেলের মৃত্যু হয়েছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা চেয়ে এই মা বলেছেন, “আমি বেঁচে না থাকলেও আমার আহনাফের বিচারটা কইরেন।” এ সময় তিনি আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরার উত্তর দিতে গিয়ে বলেন, “আমার সন্তান মারা গেছে। এই সিচ্যুয়েশনে এসে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া যায়?”

রবিবার (২৫ জানুয়ারি) ঢাকার সপ্তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ তাওহীদা আক্তারের আদালতে তিনি এসব কথা বলেন।

আসামিদের পক্ষে তাদের আইনজীবী আনোয়ারুল কবীর বাবুল ও মাইন উদ্দিন মৃত আহনাফের মা খায়রুন আক্তারকে জেরা করেন। জেরায় দাবি করা হয়, আহনাফের চিকিৎসায় বাঁধা দেন তার স্বজনরা। আহনাফের যখন আইসিইউতে চিকিৎসা চলছিল তখন তারা মব সৃষ্টি করেন। আহনাফকে আইসিইউ সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্সে নিতেও বাঁধা দেন। কেমিক্যাল রিপোর্ট তদবির করে তৈরি করেছেন। আহনাফের মৃত্যু অবহেলায় নয়, বরং দুর্ঘটনায়। তবে, বিরোধী আইনজীবীদের এসব কথা সত্য নয় বলে জানান আহনাফের মা। 

গত বছরের ৬ মার্চ মালিবাগের জে এস হাসপাতালের পরিচালক চিকিৎসক এস এম মুক্তাদির, চিকিৎসক মাহাবুব মোরশেদ ও চিকিৎসক ইশতিয়াক আজাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়। বিচার শুরুর পর আহনাফের বাবা ফখরুল আলম, তার স্বজন মোন্তাসির আল হাসানের সাক্ষ্য শেষ হয়েছে। খায়রুন নাহার গত ১১ জানুয়ারি সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন। ওইদিন তার জবানবন্দি গ্রহণ শেষে জেরা শুরু হয়। আজ অবশিষ্ট জেরার দিন ধার্য ছিল। এদিন স্বামীকে নিয়ে আদালতে উপস্থিত হন খায়রুন নাহার।

সাক্ষ্য শেষে আদালত সবার উদ্দেশে বলেন, “এই মামলার সবচেয়ে ইমোশনাল সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষ হয়েছে। যদিও আমরা বিব্রতকর কিছু ফেসও করেছি।” এ সময় বিচারক ফখরুল আলমকে স্ত্রী খায়রুল নাহারের টেক কেয়ার করতে বলেন। তিনি (খায়রুন নাহার) যে আজ সাক্ষ্য দিয়েছেন সেটা ভুলে যেতে বলেছেন। স্বাভাবিক থাকার পরামর্শ দেন। একপর্যায়ে খায়রুন নাহার বিচারককে বলেন, “আমি অন্তঃসত্ত্বা। আমি যদি বেঁচে না থাকি, মারা যায় আমার আহনাফের মৃত্যুর বিচারটা কইরেন।” এ সময় বিচারক তাকে বলেন, “আপনি ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছেন। মানসিকভাবে স্ট্রং থাকবেন। আল্লাহ তৌফিক দিলে ন্যায়বিচার হবে।” 

সংশ্লিষ্ট আদালতের সহকারি পাবলিক প্রসিকিউটর ফৌজিয়া বেগম বলেন, “খায়রুন নাহার অন্তঃসত্ত্বা। তিনি সাক্ষ্য দিতে গিয়ে কয়েকবার ইমোশনাল হয়ে কাঁদেন। বিচারক তাকে স্বাভাবিক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। আগামী ৫ মার্চ সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে।”

২০২৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আহনাফকে তার বাবা-মা ঢাকার মালিবাগ চৌধুরীপাড়ার জেএস ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল চেকআপ সেন্টারে (জে এস হাসপাতাল) নিয়ে যায়। রাত পৌনে ৮টার দিকে আহনাফের খতনা করানো হয়। খতনার পর অনেক সময় পার হলে আহনাফকে পরিবারের কাছে না দেওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন তারা। পরে জোর করেই ওটি রুমে প্রবেশ করে বাবা ফখরুল আলম আহনাফকে অচেতন অবস্থায় দেখেন, তার নাক ও মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। চিকিৎসকরা জানান, তার চিকিৎসা চলছে। পরে তাকে জোর করে ওটি থেকে বের করে দেন।

চিকিৎসার জন্য তাকে অন্য হাসপাতালে নেওয়ার কথা জানালেও কর্ণপাত করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। রাত ১০টার দিকে আহনাফকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এ ঘটনার পরদিন অর্থাৎ, ২১ ফেব্রুয়ারি ফখরুল আলম হাতিরঝিল থানায় মামলা করেন। মামলাটি তদন্ত করে ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তিন চিকিৎসককে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা হাতিরঝিল থানার এসআই সুব্রত দেবনাথ। তিন আসামি বর্তমানে জামিনে আছেন।