দেশে মাদক ব্যবহারকারী ৮২ লাখ, বেশিরভাগই তরুণ

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ এক বা একাধিক ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এসব মাদক ব্যবহারকারীর বেশিরভাগই তরুণ। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। 

গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে বা শৈশবে মাদক নেওয়া শুরু করেছে। আর ৫৯ শতাংশ মাদক নেওয়া শুরু করেছে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে। তবে এই গবেষণায় সিগারেট ধূমপানকে মাদক ব্যবহার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। 

রবিবার (২৫ জানুয়ারি) রাজধানীর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে “বাংলাদেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা, ধরন ও সংশ্লিষ্ট কারণ” শীর্ষক জাতীয় পর্যায়ের এক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। গবেষণাটির প্রধান গবেষক ছিলেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডিন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সি। 

তিনি বলেন, নারীরা সাধারণত গবেষণায় তথ্য দিতে অনাগ্রহী ছিলেন। অনেক তরুণ ধূমপান করেন না, তবে মাদক সেবন করেন। 

তিনি জানান, গবেষণা দল মূলত মাদকনির্ভরশীল ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে। গবেষণা অনুযায়ী, ৭৫ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী বিবাহিত এবং প্রায় সব সামাজিক শ্রেণির মানুষ মাদকাসক্তির সঙ্গে জড়িত। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড যৌথভাবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই গবেষণা পরিচালনা করে। দেশের আটটি বিভাগের ১৩ জেলা ও ২৬ উপজেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। 

গবেষণায় দেখা যায়, বিভাগভেদে মাদক ব্যবহারকারীর হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগে হার সবচেয়ে বেশি— ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এরপর রয়েছে রংপুর বিভাগ ৬ শতাংশ এবং চট্টগ্রাম বিভাগ ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। রাজশাহী বিভাগে হার তুলনামূলক কম— ২ দশমিক ৭২ শতাংশ। খুলনা বিভাগে হার ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। 

সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী রয়েছে ঢাকা বিভাগে— প্রায় ২২ লাখ ৯০ হাজার। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে প্রায় ১৮ লাখ ৮০ হাজার এবং রংপুর বিভাগে প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার মাদক ব্যবহারকারী রয়েছে।  

মাদকের ধরন অনুযায়ী, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো গাঁজা, প্রায় ৬১ লাখ মানুষ এই মাদকদ্রব্যের ব্যবহারকারী। এরপর রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন, প্রায় ২৩ লাখ মানুষ এটি ব্যবহার করেন। ২০ লাখ মানুষ মদ্যপার করেন। এরপর যথাক্রমে রয়েছে কোডিনযুক্ত কফ সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইন। প্রায় ৩৯ হাজার মানুষ ইনজেকশনযোগ্য মাদক ব্যবহার করেন, তারা এইচআইভি, হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। 

গবেষণায় আরও দেখা যায়, মাত্র ১৩ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী কখনও কখনও চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পেয়েছে। অর্ধেকের বেশি মাদক ছাড়ার চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং সামাজিক ও আর্থিক সহায়তার অভাবে বেশিরভাগই সফল হতে পারেনি। 

গবেষণায় তথ্য দেওয়া মাদক ব্যবহারকারীরা তাদের সবচেয়ে জরুরি চাহিদা হিসেবে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা (৬৯ শতাংশ), কাউন্সেলিং (৬২ শতাংশ) এবং কর্মসংস্থান সহায়তা (৪১ দশমিক ২ শতাংশ) উল্লেখ করেছেন। প্রায় ৬৮ শতাংশ মাদক ব্যবহারকারী পরিবার ও সমাজে কলঙ্ক ও বৈষম্যের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। 

গবেষণায় বলা হয়, বেকারত্ব, বন্ধুদের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ এবং অনানুষ্ঠানিক পেশায় সম্পৃক্ততা মাদক ব্যবহারের প্রধান ঝুঁকির কারণ। উদ্বেগজনকভাবে, প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতার কথা। 

অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুর আলম। তিনি বলেন, “মাদকাসক্ত কেবল একটি ছোট গোষ্ঠীর সমস্যা— এমন ভাবার কোনও সুযোগ নেই। আমরা বা আমাদের সন্তানরা নিরাপদ— এমন ভাবারও কারণ নেই। সন্তানরাও মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্মিলিত ও সচেতনভাবে কাজ করতে হবে।” 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, “মাদক প্রতিরোধের কাজ পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। দেশের সর্বত্র মানুষ মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে ‘সামাজিক যুদ্ধের’ মতো করে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।”  

তিনি জানান, সরকার সাতটি বিভাগে সাতটি মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে, যেখানে প্রতিটি কেন্দ্রে দুই’শ শয্যা থাকবে।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর ট্রেজারার অধ্যাপক ডা. নাহরিন আখতার, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ গোলাম আজম, সহ-গবেষক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এবং সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক ডা. মো. শহিদুল হাসান বাবুলসহ অন্যরা।