গুমের জবানবন্দিতে আযমী

ছেঁড়া লুঙ্গি সেলাই করতে করতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন দর্জি

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত প্রয়াত অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী নিজের গুমের ঘটনার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি প্রদান করেছেন। গুমের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি জবানবন্দিতে বলেছেন, ছারপোকার কামড়ে শরীর আর কাপড় রক্তাক্ত হয়ে যেত। নামাজের জন্য মেলেনি আলাদা লুঙ্গি। বাধ্য হয়ে রক্তমাখা কাপড়েই নামাজ আদায় করতে হতো। ছেঁড়া জায়গায় সেলাই করতে করতে দর্জিও অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন।

জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে (জেআইসি) গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ তিনি সাক্ষ্য প্রদান করেন।

জবানবন্দিতে আযমী বলেন, ঘুমানোর জন্য দেওয়া তোষকে শত শত ছারপোকা ছিল। কামড়ে পুরো শরীর ও কাপড় রক্তাক্ত হয়ে যেত। রক্তমাখা কাপড় নিয়ে নামাজ পড়তে সমস্যার কথা জানিয়ে আলাদা লুঙ্গি চাইলেও দেওয়া হয়নি। আগে যা দিয়েছিল তা ছিল নিম্নমানের। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ছিঁড়ে গিয়েছিল। ছেঁড়া জায়গায় সেলাই করতে করতে দর্জিও অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। এজন্য নিজেই হাতে সেলাইয়ের জন্য সুঁই-সুতা চেয়েছিলাম। কিন্তু তারা দেননি। শেষ পর্যন্ত ছেঁড়া জায়গায় গিট্টু দিয়ে ব্যবহার করতে হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, আমাকে অপহরণের একমাস পর ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা ৫০ মিনিটে একজন কর্মকর্তা বলেন,  একটি অঘটন ঘটার আশঙ্কায় আপনাকে নিয়ে আসা হয়েছিল। সেই শঙ্কা কেটে গেছে। এখন আপনাকে মুক্তি দেওয়ার সময় এসেছে। তার কাছে জানতে চাইলাম— আমি কি মুক্তির জন্য ঘণ্টা নাকি দিন গুনবো। ওই কর্মকর্তা জবাব দিলেন, আপনি একজন জেনারেল। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারেন যে, আপনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসতে হবে। এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারবো না।

এর একমাস পর ১৯ অক্টোবর প্রথমবারের মতো আযমীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একই বছরের ২২ অক্টোবর ও ৭ ডিসেম্বর আরও দুবার জিজ্ঞাসাবাদ করেন তারা।

জিজ্ঞাসাবাদ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, তারা বিভিন্ন কর্মকর্তার সঙ্গে আমার কথাবার্তা, পরিচয়, সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন করতেন। তবে সবচেয়ে বেশি জানতে চাইতেন জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কিনা। এছাড়া ভারতের বিরুদ্ধে ফেসবুকে এত লেখালেখি করি কেন, তা নিয়েও প্রশ্ন করা হতো। জামায়াত প্রসঙ্গে আমি বলি— আমাকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করার সাত বছর দুই মাস পর আপনারা অপহরণ করেছেন। এই দীর্ঘদিন আপনাদের গোয়েন্দা বাহিনী আমার পেছনে ঘুরেছেন। জামায়াতের সঙ্গে আমার ন্যূনতম সম্পর্কের রিপোর্ট কি আপনাদের কাছে আছে? জিজ্ঞাসাবাদে আরও বলেছি, অন্যান্য দলের মতো জামায়াতে উত্তরাধিকারী সূত্রে কেউ নেতা হন না। আপনারা তো রাজনীতি নিয়ে অনেক গবেষণা করেন। একটি উদাহরণ দেখান, যেখানে জামায়াতের কোনও নেতা উত্তরাধিকার সূত্রে নেতৃত্ব পেয়েছে।

এসব বলার পরও তারা চাপাচাপি করতে থাকেন স্বীকার করার জন্য যে, আমি জামায়াতের আমির হতে যাচ্ছিলাম। এতে আমি জবাব দেই, আমার বাবা জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা আমির বটে। তবে ওই দলের সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। যেহেতু সম্পর্কই নেই, সেহেতু দলের আমির হওয়ার প্রশ্ন হাস্যকর। এরপর তারা ভারতের বিরুদ্ধে আমার লেখালেখি নিয়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।

তখন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে আযমী বলেছিলেন, ভারতের বিরুদ্ধে যদি লেখালেখি দণ্ডনীয় অপরাধ হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা না দিয়ে, আদালতে সোপর্দ না করে, এখানে অবৈধভাবে আটক রেখেছেন কেন। এছাড়া সেনাবাহিনীর ৩০ বছর চাকরিতে আমাকে শিখিয়েছে যে, ভারত আমাদের প্রধান শত্রু। এটা যদি অপরাধ হয়— তাহলে এ সময়জুড়ে সেনাপ্রধানসহ যেসব জেনারেল আমাকে শিখিয়েছেন তারা একই অপরাধে অপরাধী। এমনকি স্বাধীনতার  পর বাংলাদেশে ভারতকে কখনও বন্ধুসুলভ আচরণ করতে দেখিনি আমি।

‘পরে কর্মকর্তা আমাকে বলেন, আমরা আপনাকে নিয়ে তদন্ত করছি। তদন্ত চলমান পর্যন্ত আপনাকে এখানে থাকতে হবে। জবাবে আমি বলি, কিসের তদন্ত। কোনও অঘটন সংঘটিত হওয়ার পর তদন্ত হয়। তাহলে আপনারা কিসের তদন্ত করছেন? জবাবে কর্মকর্তা বলেন, আপনি লুকিয়ে লুকিয়ে কিছু করেছিলেন কিনা তা তদন্ত করা হচ্ছে। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কেয়ামত পর্যন্ত শেষ হবে না বলতেই তারা ক্ষুব্ধ আচরণ শুরু করেন।’

‘ওই সময় তাদের কাছে জানতে চাই যে, আপনারা কি আমাকে মেরে ফেলবেন নাকি। জবাবে ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, মেরে ফেলতে চাইলে তো আরও আগেই খাল-বিলে নিয়ে মেরে ফেলতাম।’

তিন নম্বর সাক্ষী হিসেবে টানা দুদিন সাক্ষ্য দিয়েছেন আযমী। প্রথম দিনের জবানবন্দিতে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করাসহ কীভাবে, কোথা থেকে গুম করা হয়, তা তুলে ধরেন তিনি। দ্বিতীয় দিনে অবশিষ্ট জবানবন্দি শেষে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার চেয়ে ট্রাইব্যুনালের কাছে আর্জি জানানো হয়।

পরে তার জেরার জন্য আগামী ৫ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০১৬ সালের ২২ আগস্ট গুমের শিকার হন অবসরপ্রাপ্ত এই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট মুক্তি মেলে তার। তবে ২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বরের পর মুক্তির আগ পর্যন্ত আর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি বলে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন আযমী।