জামায়াতের আমিরের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাকের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া বঙ্গভবনের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমের জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত। পাঁচ হাজার টাকা মুচলেকা দেওয়ার শর্তে তাকে জামিন দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জুনাইদের আদালত শুনানি শেষে এই আদেশ দেন।
জামিনের খবর শুনে খুশিতে আবেগাপ্লুত হয়ে পরেন ছরওয়ারের স্ত্রী শামীম আরা। তিনি বলেন, “আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি, আদালতকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তারা বুঝতে পেরেছে যে তিনি (ছরওয়ারে আলম) নির্দোষ। এজন্যই তাকে জামিন দিয়েছে। এভাবে কোনও নির্দোষ ব্যক্তিকে যেনো গ্রেফতার করে আর হয়রানি না করা হোক।” এই হ্যাকিংয়ের ঘটনার সঙ্গে জড়িতকে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বের করার দাবি জানান এই নারী।
এদিকে, জামিনের খবরে সংক্ষুব্ধ হন বাদীপক্ষের আইনজীবীরা। আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক বলেন, “আদালত কাউকে জামিন দিতেই পারেন কিন্তু মামলার প্রথম দিনেই এই ধরনের স্পর্শকাতর একটা বিষয়ে জামিন দেওয়া প্রশ্নের ব্যাপার। সারাবিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় এই স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আসামি ছরওরয়ারে আলম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য এই কাজটি করেছিলেন। তিনি মহিলাদেরকে উসকানি দেওয়ার জন্য জামায়াত আমিরের আইডি হ্যাক করেই এটা করেন। তদন্ত কর্মকর্তার দরকার ছিল রিমান্ড আবেদন করা। কারণ, এদেশে মাছ চুরি, শাক চুরি করলেও ১০ থেকে ১৫ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। সেখানে এমন একটা স্পর্শকাতর বিষয়ে রিমান্ড চাওয়া হয়নি। উল্টো তাকে জামিন দেওয়া হয়েছে।”
এদিন ছরওয়ারে আলমের পক্ষে তার আইনজীবী আলমগীর হোসেন জামিন আবেদন করেন। অপরদিকে, বাদীপক্ষের আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক তার জামিন বাতিল চেয়ে শুনানি করেন। উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আদালত আদেশ অপেক্ষমাণ রেখে ঘণ্টাখানেক পর জামিনের আদেশ দেন।
শুনানিতে বাদীপক্ষের আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক আদালতে বলেন, “আজকের আসামি যে কাজ করেছে সেটা স্বৈরাচারী সরকারের প্রেতাত্মা হিসেবে করেছেন। স্বৈরাচারের প্রেতাত্মা ওনার ওপরে ভর করেছে। জামায়াতের আমিরের মতো সম্মানিত লোকের আইডি হ্যাক করা কি উনার কাজ। তার মতো লোককে তিনি কোন কারণে হয়রানি করলো। উনি দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য এটা করেছে। মহিলা ভোটার যেহেতু অনেক এই কারণে তাদেরকে উত্তেজিত করার জন্য জামাতের আমিরের নামে ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করেছে।”
মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে উদ্দেশ্যে করে আদালতে বাদীপক্ষের আইনজীবী বলেন, “এই দেশে শাক পাতা চুরি করলেও ৭ থেকে ৮ দিন রিমান্ড চাওয়া হয়। আইও কি কারণে রিমান্ড চায়নি জানি না। নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য এটা করেছে। তার জামিন তো হবেই না। আসামির বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদন করা উচিত ছিল। কারণ, এখানে জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপার আছে। উনি দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য এটা করেছে।”
রাষ্ট্রপক্ষের পিপি আদালতে বলেন, “যেহেতু এই আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট এলিগেশন আছে এজন্য তাকে কারাগারে পাঠানো হোক। পরে তদন্ত করে যখন দরকার রিমান্ড চাওয়া হবে। যেহেতু আজকে রিমান্ড চায়নি এজন্য তাকে আপাতত কারাগারে পাঠানো হোক।”
আদালতে ছরওয়ারে আলম বলেন, “আমি সজ্ঞানে বলছি, কয়েকদিন পর রিটায়ার্ডে যাবো, এই সময়ে আমার হাত দিয়ে এই বয়সে এসব কাজ হয়নি। এমনকি, এসব কখনো কল্পনা করি নাই, সত্যি বলছি। আমি সব দিয়ে দিয়েছি পুলিশকে তদন্ত করার জন্য। তারা তদন্ত করে দেখুক কিছু পায় কি না। আমি নিজেকে শতভাগ নির্দোষ দাবি করছি।” পরে আদালত তাকে জিজ্ঞেস করেন, “আপনাকে কোথা থেকে ধরেছে।” জবাবে তিনি বলেন, “গত পরশু রাত ১০টার দিকে বাসা থেকে ধরছে।”
ছরওয়ারের স্ত্রী শামীম আরা স্বামীকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে শুনানি শেষে আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, “সে ৩২ বছর ধরে সম্মানের সঙ্গে সরকারি চাকরি করেছে। এটা একটা বাচ্চাও বুঝে, কোনও হ্যাকার কি নিজের ঠিকানা দিয়ে হ্যাক করবে। তিনি কোনও রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত না। যদি জড়িত হতো তাহলে সে আওয়ামী লীগের ১৭ বছর এবং এর আগে কোনোভাবে চিহ্নিত হতো। কারণ, সে এখানে দীর্ঘ বছর চাকরি করেছে। তার কাজ ছিল চাকরি করে বাসায় আসা এবং বাজারে যাওয়া আসা। এছাড়া আর কিছু করতো না সে। তার এখন রিটায়ার্ডের সময়। কোনও মানুষ কি জেনে বুঝে নিজের পায়ে কুড়াল মারবে।”
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমসহ অজ্ঞাতনামা ১৫ বা ২০ জন আসামি গত ৩১ জানুয়ারি বিকাল ৫টার দিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে। পরে তারা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পোস্ট করে। পোস্টে নারীর প্রতি বিদ্বেষ, অশ্লীলতা, জাতিগত সহিংসতা, ঘৃণা ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা ছড়ায়। অল্প সময়ের মধ্যেই অ্যাকাউন্টটি পুনরুদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় গত বুধবার রাজধানীর হাতিরঝিল থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ আইনে মামলা করেন দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য মো. সিরাজুল ইসলাম।”