বর্জ্য পোড়ানোর বিষাক্ত ধোঁয়া আর দুর্গন্ধে দিশেহারা নগরবাসী

রাজধানীর মাতুয়াইলে অবস্থিত দেশের সবচেয়ে বড় ল্যান্ডফিল (বর্জ্যের ভাগাড়)। এটি মাতুয়াইলবাসীর দুঃখের প্রধান কারণ। ল্যান্ডফিলে বর্জ্য পোড়ানো ধোঁয়া আর ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধে বিপর্যস্ত সেখানকার জনজীবন। শুধু মাতুয়াইল নয়, এর ভুক্তভোগী ডেমরা, কোনাপাড়া, যাত্রাবাড়ী, জুরাইন এমনকি রাজধানীর মতিঝিলের বাসিন্দারাও।

জানা গেছে, সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও গত দুই সপ্তাহ ধরে ল্যান্ডফিলে বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে। ফলে বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে মাতুয়াইলের স্থানীয় বাসিন্দাদের। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মাতুয়াইলের ল্যান্ডফিলে থেকে থেকে ধোঁয়া উঠছে। এই ধোঁয়ার বিস্তৃতি যতদূর চোখ যায় ততদূর। এই বিষাক্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে ল্যান্ডফিল্ডের আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায়। এতে শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্টে ভুগছেন ওইসব এলাকার বাসিন্দারা।

মাতুয়াইলের বাসিন্দা বাইজীদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রোজার প্রথম দিন থেকে ল্যান্ডফিলে আগুন জ্বলছে। সেই ধোঁয়ায় পুরো আকাশ কালো হয়ে গেছে। কয়েক দিন ধরে অবস্থা খুবই খারাপ। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ঠিকমতো অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে না। নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় নাকে বিচ্ছিরি পোড়া গন্ধ লাগে। আমাদের সন্তানদের অবস্থা আরও করুন। আমরা প্রতিনিয়ত অক্সিজেনের বদলে বিষ গ্রহণ করছি। অথচ সিটি করপোরেশনের টনক নড়ছে না।

মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলে কর্মরত বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে। তাদের একজন নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ভেতরের জমে থাকা ময়লা থেকে গ্যাস তৈরি হয়ে সেখানে মাঝেমধ্যে নিজ থেকেই আগুন লেগে যায়। এমন ঘটনা বেশ কয়েকবার ঘটেছে। রমজান মাস এলেই ময়লায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটে বলেও দাবি তার। গত রমজানেও এমন ঘটনা ঘটেছিল বলে জানান তিনি।

মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের সিকিউরিটি আব্দুল মজিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এখানে প্রতিদিন ঢাকা শহরের সব ধরনের ময়লা-আবর্জনা ট্রাকে করে এনে ফেলা হয়। যেসব ময়লা আবর্জনা পচনশীল সেগুলো থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। আর যেগুলো পলিথিন প্লাস্টিক জাতীয় সেগুলোতে মাঝেমধ্যে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়। না পোড়ালে এত ময়লা যাবে কোথায়। তবে পোড়ানোর সময় এখানে দাঁড়িয়ে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয় বলেও জানান তিনি।

মাতুয়াইলের স্থানীয় বাসিন্দা রেদোয়ান আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ল্যান্ডফিলে আগুন নিজে থেকে লাগে না, আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। কাঁচা ময়লায় কেমিক্যাল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় ওখানে কর্মরত লোকজন। আগুন লাগানোর পর চারপাশে যে পরিমাণ ধোঁয়া সৃষ্টি হয় এর মধ্যে নিঃশ্বাস নেওয়া খুব কষ্টকর হয়ে যায়। বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্কদের শ্বাসকষ্ট হয়ে যায়।

ক্ষুব্ধ হয়ে মাতুয়াইলের এই বাসিন্দা বলেন, আমি ভাবছি এটার বিরুদ্ধে মামলা করবো। কারণ এটা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। আবার এটা যেহেতু সরকারিভাবে হচ্ছে সেহেতু আমার ঝামেলায় পড়তে হয় কিনা সেই দ্বিধায় আছি। তবে এর একটা সুষ্ঠু সমাধান দরকার। সিটি করপোরেশন ও সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, এখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করুন। আমাদের একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।

ডেমরার বাসিন্দা ও স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া শিমু বলেন, বিগত সময়ে শুনেছি এখানকার পচনশীল ময়লা-আবর্জনা দিয়ে সার তৈরি করা হবে। গ্যাস উৎপাদনের কথাও অনেকে বলেছেন। কিন্তু বছরের পর বছর যায় তার কোনও অগ্রগতি নেই। উল্টো ময়লা-আবর্জনা পুড়িয়ে আশেপাশের এলাকা দিনের পর দিন বিষাক্ত করে তুলছে।

এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, এখানকার ময়লা-আবর্জনা কীভাবে না পুড়িয়ে কাজে লাগানো যায় এবং দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দেওয়া যায় তার যৌক্তিক সমাধান বের করা জরুরি। সরকারকে আহ্বান জানাবো, অবিলম্বে এর টেকসই সমাধান বের করে নগরবাসীকে এই ময়লা-আবর্জনার বিষাক্ত ধোঁয়া থেকে রক্ষা করুন।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে আক্ষেপ জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহাতাব হোসেন বলেন, কোনও সভ্য দেশে এরকম বাজে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নেই। উন্নত দেশগুলোতে বাসা থেকে বর্জ্য সংগ্রহের সময়ই পচনশীল আর অপচনশীল বর্জ্য আলাদা করে ফেলা হয়। এটা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রাথমিক কাজ। অথচ আজ এত বছরেও আমাদের সিটি করপোরেশন এ কাজটাও করতে পারছে না। কোনও উদ্যোগই নেওয়া হয়নি।

মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল্ড ও রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সহ-সভাপতি নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ ঘটনা দু-একদিনের নয়, দীর্ঘদিনের। সরকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার কারণে সাধারণ মানুষ বিষাক্ত ধোঁয়ায় ভুগছে। বর্জ্য নিয়ে ব্যবসা করতে রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা কাড়াকাড়ি করেন। জনগণকে সঠিক সেবা না দিয়ে বর্জ্য দিয়ে নিজেরা ব্যবসা করেন।

তিনি আরও বলেন, যদি সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যেতো, কোনও ধরনের দুর্নীতি এবং লুটপাট ছাড়া, তাহলে আমাদের বর্জ্য সম্পদে রূপান্তরিত হতো অনেক আগে। দেশে এখন নতুন সরকার এসেছে। আমরা আশা করবো, এই সরকার জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ নজর দেবে। বর্জ্যকে কীভাবে সম্পদে রূপান্তর করা যায় সেই উদ্যোগ নেবে।

ল্যান্ডফিলে আগুন ও ধোঁয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ল্যান্ডফিলের আগুন জ্বলার খবর শুনে তা নেভানো হয়েছে। ধোঁয়া এখনও কিছুটা আছে, সেটাও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য আমরা কাজ করছি। একইসঙ্গে ল্যান্ডফিল্ডে আর কোনোভাবেই যেন আগুন না লাগে, সেই বিষয়ে দায়িত্বরতদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ডিএসসিসির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এখনও অনেক পিছিয়ে। এর আগেও সঠিকভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য সিটি করপোরেশন থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কিন্তু তা আলোর মুখ দেখেনি। বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করার জন্য আমরা এরই মধ্যে কোরিয়ান একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছি। এক-দেড় মাসের মধ্যে কাজ শুরু হয়ে যাবে। তখন বর্জ্য আমাদের জন্য আর বোঝা হবে না।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হবে। ঢাকা সিটিকে একটি আধুনিক সিটিতে রূপান্তরিত করতে প্রথমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ করতে হবে। তবে এখানে নগরবাসীরও দায়িত্ব রয়েছে।