২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি একাধিক জেলায় নীরবে, সাহসের সঙ্গে কাজ করলেও গণমাধ্যম ও জনসাধারণের কাছে তারা ‘নিষ্ক্রিয়’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিল।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকরা যখন বিক্ষোভকারী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পথচারীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছিলেন এবং অ্যাম্বুলেন্সগুলো যখন শত শত আহত লোককে নিরাপদে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন বৃহত্তর জনসাধারণের বিবরণ একটি ভিন্ন গল্প বলেছিল। অনেকেই জানতেন না ন্যাশনাল সোসাইটি কী করছে এবং স্পষ্ট, সময়োপযোগী এবং আত্মবিশ্বাসী যোগাযোগের অভাবে সেই অবিশ্বাস আরও গভীর হয়েছিল।
দুর্যোগকালে ছড়িয়ে পড়া ভুল, বিভ্রান্তিকর ও ক্ষতিকর তথ্য মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং মানুষের জীবনকে আরও বেশি ঝুঁকিতে ফেলছে বলে ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস এন্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি)-এর ‘ওয়ার্ল্ড ডিজাস্টার রিপোর্ট ২০২৬’-এর শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা দুর্যোগ পরিস্থিতিতে ভুল তথ্য মানবিক সহায়তার ওপর আস্থা নষ্ট করছে। রবিবার (৮ মার্চ) এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে আইএফআরসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি একটি উল্লেখযোগ্য মানবিক প্রতিক্রিয়া জাগিয়ে তুলেছিল। সারাদেশের নয়টি শাখায় ২১টি দল মোতায়েন করা হয়েছিল, শত শত লোক প্রাথমিক চিকিৎসা পেয়েছিল এবং দুই হাজারেরও বেশি পরিবারের কাছে খাদ্য সহায়তা পৌঁছেছিল। তবে ন্যাশনাল সোসাইটি দ্রুত স্বীকার করেছে আমরা এই গল্পটি সময়মতো বা সঠিক উপায়ে বলিনি এবং এমন একটি সংকটে যেখানে উপলব্ধি বাস্তবতাকে রূপ দেয়, সেই নীরবতার একটি মূল্য দিতে হয়েছিল। অস্থিতিশীল এবং রাজনৈতিকভাবে অভিযুক্ত প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির নেতৃত্ব রাজনীতিকরণের ঝুঁকি হ্রাস করতে, স্বেচ্ছাসেবকদের রক্ষা করতে এবং পক্ষপাতদুষ্ট আখ্যানে আকৃষ্ট হওয়া এড়াতে নীরবে কাজ করতে হয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবে এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। যদিও এই পদ্ধতিটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে বোধগম্য ছিল, এই নীরবতা এবং জনসাধারণের দৃশ্যমানতার অভাব একটি তথ্য শূন্যতা তৈরি করেছিল— যা দ্রুত জল্পনা, সমালোচনা এবং সংগঠনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাজনৈতিক আখ্যান দ্বারা পূরণ করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এর ফলশ্রুতিতে সুনাম ব্যাপক ক্ষুণ্ণ হয়েছে। কিছু জেলায়, স্বেচ্ছাসেবকদের হয়রানি করা হয়েছিল, স্থানীয় এনজিওগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বে ভাটা পড়েছিল এবং দাতা ও আন্দোলনের অংশীদারদের কাছ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, যা সব স্টেকহোল্ডারদের আস্থা বজায় রেখে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল প্রেক্ষাপটে কাজ করার জন্য রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ক্ষমতা সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিভিন্ন দুর্যোগে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে প্রায় ৭০ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সময় ১০ কোটির বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ। একই সঙ্গে মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয় মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
দুর্যোগকালে তথ্যের বিভ্রাট সম্পর্কে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অমানবিক মন্তব্য মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি করছে। এতে মানবিক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ অনেক সময় প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
আইএফআরসির মহাসচিব জাগান চাম্পাগান এ বিষয়ে বলেন, “প্রতিটি দুর্যোগ ও সংকটে আমরা খেয়াল করছি— খাদ্য, পানি ও আশ্রয়ের মতো সঠিক তথ্যপ্রাপ্তিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন ভুল, বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে তথ্যের বিকৃতি করা হয়, তখন ক্ষতিকর মানুষের মধ্যে ভয় বাড়ায়, মানবিক সহায়তায় পথ বাধাগ্রস্ত করে এবং অনেক ক্ষেত্রে মানুষের জীবনও ঝুঁকির মুখে ফেলে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়েহে, বিশ্বের প্রায় ৯৪ শতাংশ দুর্যোগই স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্যোগে মোকাবিলা করা হয়, যেখানে আন্তর্জাতিক সহায়তা খুব সীমিত থাকে। এ ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবক, স্থানীয় নেতৃত্ব, কমিউনিটি ও গণমাধ্যম মানুষের সবচেয়ে বিশ্বস্ত তথ্যদাতা। তবে বর্তমানে তারা ক্রমবর্ধমানভাবে বিভক্ত ও উত্তেজনাপূর্ণ তথ্য পরিবেশের মুখোমুখি হচ্ছেন।
আইএফআরসির মহাসচিব আরও বলেন, “মানুষের আস্থা না থাকলে তারা দুর্যোগের আগে প্রস্তুতি নেবে না, প্রয়োজনের সময় সাহায্য চাইবে না বা জীবনরক্ষাকারী নির্দেশনা মেনে চলবে না। কিন্তু আস্থা থাকলে মানুষ একসঙ্গে কাজ করে সংকট মোকাবিলা করতে পারে এবং দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তাই আস্থা বজায় রাখা মানবিক কার্যক্রমের জন্য অপরিহার্য।”
করণীয়—
প্রতিবেদনটি সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, মানবিক সংস্থা এবং জনসাধারণের জন্য কয়েকটি সুপারিশ করেছে—
প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম: সংকটের সময় বিশ্বস্ত মানবিক ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং ক্ষতিকর তথ্য দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
সরকার ও নীতিনির্ধারক: প্রমাণভিত্তিক নীতি ও নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে হবে এবং সংকট ও ক্ষতিকর তথ্য পর্যবেক্ষণে স্থানীয় তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে হবে।
মানবিক সংস্থা: ভুল তথ্য মোকাবিলাকে মানবিক কার্যক্রমের মূল অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং কমিউনিটির সঙ্গে শক্তিশালী যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে।
কমিউনিটি ও স্থানীয় অংশীজন: গুজব সনাক্ত করা, ডিজিটাল ও মিডিয়া লিটারেসি বাড়ানো এবং সঠিক তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।