সদ্য গঠিত সরকারের প্রথম ২৮ দিনের কার্যক্রম নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন যে প্রধানমন্ত্রীর ‘২৮ দিনে ২৮ পদক্ষেপ’ তুলে ধরেছেন, তা নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী ও আশাব্যঞ্জক সূচনার প্রতিচ্ছবি। নতুন সরকারের গতিশীল যাত্রার এটি একটি স্পষ্ট উদাহরণ। স্বীকার করতেই হবে যে, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রায় প্রতিটি খাতে-সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, প্রশাসনিক সংস্কার, অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলা— একযোগে উদ্যোগ গ্রহণ একটি বিরল রাজনৈতিক সংকল্পের পরিচয় বহন করে।
এই পদক্ষেপগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো—স্বল্পসময়ে হাজার হাজার পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা, কৃষকদের জন্য ঋণ মওকুফ ও সহায়তা, প্রশাসনিক ব্যয় কমাতে ভিভিআইপি প্রটোকল হ্রাস, সংসদ সদস্যদের বিশেষ সুবিধা পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কাঠামোগত উদ্যোগ এবং বাজার স্থিতিশীল রাখার প্রচেষ্টা। এগুলো কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং সরকারের জনগণের আরও কাছাকাছি আসার একটি সুস্পষ্ট বার্তা।
একটি নতুন সরকারের জন্য প্রথম মাসেই এত বিস্তৃত পরিসরে কাজ শুরু করা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক আস্থা তৈরি করে। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আসে— রাষ্ট্র পরিচালনায় উদ্যোগের সংখ্যা নয়, তার গুণগত প্রভাবই শেষ পর্যন্ত জনগণের আস্থা নির্ধারণ করে।
বাংলা ট্রিবিউন পত্রিকায় সম্প্রতি প্রকাশিত আমার ধারাবাহিক লেখা ‘বিজয়ের রক্ষাকবচ’-এ যে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে, সেটি হলো—বিজয় ধরে রাখতে হলে দৃশ্যমান, কার্যকর এবং ন্যায়ভিত্তিক পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা আমাদের সতর্ক করে দেয়।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে ভিজিএফ বরাদ্দকে ঘিরে সরকারদলীয় কিছু নেতাকর্মীর কথিত ‘পার্সেন্টেজ’ দাবির অভিযোগ এবং তা প্রত্যাখ্যানকে কেন্দ্র করে এক জনপ্রতিনিধির গ্রেফতার, এই ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে— আমরা কি সত্যিই পুরোনো সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছি? এটি কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি এর পেছনে বৃহত্তর কোনও প্রবণতা কাজ করছে, তা এখনই ভেবে দেখার সময়।
ইতিহাস বলে, এ ধরনের প্রবণতা শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা ধীরে ধীরে বড় সমস্যায় রূপ নেয়। তবে এখানে একটি ইতিবাচক দিকও রয়েছে— ঘটনাটি গোপন থাকেনি। জনসমক্ষে এসেছে, গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়েছে। অর্থাৎ, সমাজে স্বচ্ছতার একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতা যদি রাষ্ট্রের দৃঢ় অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে অনিয়ম প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ড. মাহাদীর উল্লেখ করা ২৮টি পদক্ষেপের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে এই ধরনের অনিয়ম ও চাঁদাবাজির প্রবণতাকে কত দ্রুত এবং কত দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তার ওপর। কারণ চাঁদাবাজি কোনও ছোটখাটো সমস্যা নয়— এটি এক ধরনের অঘোষিত অর্থনৈতিক কাঠামো, যা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের ভিতকে দুর্বল করে। যদি কোথাও ‘পার্সেন্টেজ’ সংস্কৃতি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তবে তা শুধু একটি খাত নয়— পুরো প্রশাসনিক কাঠামোকেই প্রভাবিত করবে।
সুতরাং, সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো— একদিকে যেমন উন্নয়ন ও কল্যাণমূলক উদ্যোগ অব্যাহত রাখা, অপরদিকে তেমনই আইনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার প্রশ্নে কোনও ধরনের আপস না করা। বিশেষ করে চাঁদাবাজি ও দলীয় প্রভাবের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিকে কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এখানেই ‘কোয়ান্টিটি বনাম কোয়ালিটি’ প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রধানমন্ত্রীর ২৮ দিনে ২৮টি পদক্ষেপ একটি শক্তিশালী সূচনা— কিন্তু তার প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে কয়েকটি মৌলিক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তনের মাধ্যমে— চাঁদাবাজি দমন, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।
বাংলাদেশের মানুষ কেবল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি চায় না, তারা পরিবর্তনের বাস্তব প্রমাণ দেখতে চায়। সেই প্রমাণ যদি কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হয়, তবে এই ২৮ দিনের উদ্যোগ ভবিষ্যতের জন্য একটি কার্যকর মডেল হয়ে উঠতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, আলোচ্য ২৮ পদক্ষেপ একটি প্রশংসনীয় সূচনা এবং এটি স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। তবে সেই স্বীকৃতিকে স্থায়ী আস্থায় রূপ দিতে হলে সমানভাবে জরুরি— লালমনিরহাটের মতো দেশের সর্বত্র চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের যেকোনও পুনরুত্থানের চেষ্টা শুরুতেই কঠোরভাবে প্রতিহত করা। কারণ বিজয় অর্জনই শেষ কথা নয়, বিজয়কে সুরক্ষিত রাখা, সেই রক্ষাকবচ তৈরি করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
লেখক: সালেক উদ্দিন, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলামিস্ট