দেশে রেলপথের লেভেল ক্রসিংগুলোতে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। প্রতিদিন গড়ে তিনজনের মৃত্যু হচ্ছে এসব দুর্ঘটনায়। অনেক ক্ষেত্রে গেটম্যানের অনুপস্থিতি, অবৈধ ক্রসিং এবং যানজট পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। ফলে এর সমাধান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত ২১ মার্চ দিবাগত রাতে কুমিল্লায় ট্রেন ও যাত্রীবাহী বাসের সংঘর্ষকে ‘হিউম্যান ফেইলিউর’ বা মানবিক ত্রুটি হিসেবে দেখছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, সর্বশেষ দুর্ঘটনার বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে সরাসরি দায়ী করা ঠিক হবে না। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে দায়িত্বে থাকা গেটম্যান হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, ফলে ট্রেন আসার তথ্য তিনি সময়মতো দিতে পারেননি।
রাজধানীর খিলক্ষেত, মগবাজার ও গোপীবাগের রেল ক্রসিংয়ের চিত্র যেন দেশের সামগ্রিক বাস্তবতাই তুলে ধরে। এগুলোর কোনোটিতে আনুষ্ঠানিক কোনও গেটম্যান নেই। খিলক্ষেতে একটি বাঁশ দিয়ে রাস্তা আটকে রাখা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, খিলক্ষেত ক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন নারী, শিশু ও বয়স্করা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হন। এখানে একজন গেটম্যান জরুরি। কেউ না থাকায় তারা নিজেরাই এ ব্যবস্থা করেছেন। দুই দিক থেকেই ট্রেন আসে, ফলে ঝুঁকি আরও বেশি।
গোপীবাগ ও মগবাজারের লেভেল ক্রসিংয়েও একই চিত্র দেখা যায়। রেললাইনের ওপর বসে আড্ডা দিচ্ছেন মানুষ, অনেকেই মোবাইলে কথা বলতে বলতে লাইন পার হচ্ছেন। সিগন্যাল থাকলেও তা মানছেন না কেউ। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর মগবাজার লেভেল ক্রসিংয়ে একটি বাস আটকে পড়লে ট্রেনের ধাক্কায় সেটি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। গেটম্যানরা বলছেন, অনেকেই নিয়ম মানতে চান না। ধাক্কা দিয়ে দৌড়ে পার হন, বাঁশ ফেলার পরও গাড়ির গতি কমান না। তবে নিজেদের মধ্যেও কিছু গাফিলতি রয়েছে বলে স্বীকার করেন তারা।
২১ মার্চ দিবাগত রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় লেভেল ক্রসিংয়ে ওঠা একটি বাসে ট্রেনের ধাক্কায় ১২ জনের প্রাণহানি হয়। সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এটি। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট রেল দুর্ঘটনার প্রায় ৮৯ শতাংশই ঘটে লেভেল ক্রসিংয়ে।
রেল মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে এসব ক্রসিংয়ে মারা গেছেন ২৬৩ জন। তবে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রেল দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১ হাজার ২৬৯ জনের। অপরদিকে রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে রেল দুর্ঘটনায় মোট মৃত্যু ৯ হাজার ২৩৭ জন। গড়ে প্রতিদিন প্রায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রযুক্তির এই যুগেও লেভেল ক্রসিং ব্যবস্থাপনা এখনও ম্যানুয়াল পদ্ধতিনির্ভর। মূল সমাধানের জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। লেভেল ক্রসিংয়ে অটোমেশন ছাড়া এই সমস্যা কমানো কঠিন। যেমন- মেট্রোরেল পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর। রেলওয়েকেও ধাপে ধাপে সেই পথে যেতে হবে।
লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনার পেছনে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, জনবল সংকট এবং মানবিক ত্রুটি— সব মিলিয়েই বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। কার্যকর প্রযুক্তি, কঠোর নজরদারি ও জনসচেতনতা ছাড়া এই ঝুঁকি কমানো কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কুমিল্লার দুর্ঘটনাকে প্রাথমিকভাবে ‘হিউম্যান ফেইলর’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
তিনি জানান, ট্রেন আসার আগে লেভেল ক্রসিং বন্ধ করার নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। এটি স্টেশন থেকে ক্রসিংয়ের দূরত্বের ওপর নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ, কোনও ক্রসিং যদি স্টেশন থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে হয়, তাহলে ট্রেন ছাড়ার প্রায় ৫ মিনিট আগে গেটম্যানকে জানানো হয়।
আফজাল হোসেন আরও বলেন, ‘‘দেশে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা ৩ হাজারের বেশি। তবে সব জায়গায় গেটম্যান নেই। মোট ক্রসিংয়ের অর্ধেকেরও কম স্থানে গেটম্যান রয়েছে, যা মূলত জনবল সংকটের কারণে। অটোমেটিক গেট চালুর উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ নিয়ম না মেনে জোর করে গেট ভেঙে ঢুকে পড়ে।’’
তদন্ত হয়, শাস্তি কম
প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা কম নেওয়া হয়, এমন অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে মহাপরিচালক বলেন, ‘‘হিউম্যান ফেইলিউর’ পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। তবে দুর্ঘটনার পর গেটম্যানদের সচেতন করতে মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম ও মনিটরিং জোরদার করা হয়।’’
তিনি বলেন, ‘‘২৪ ঘণ্টার ডিউটির জন্য রোস্টার থাকলেও রাতের নির্জনতায় ক্লান্তির কারণে ঘুমিয়ে পড়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। মানুষের শারীরিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এটি পুরোপুরি প্রতিরোধ করা না গেলেও কমানো সম্ভব।’’
যা বলছেন প্রতিমন্ত্রী
কুমিল্লার দুর্ঘটনার পরদিন রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, ‘‘ঝুঁকিপূর্ণ ও পুরোনো রেলক্রসিংগুলোতে দুর্ঘটনা কমাতে ওভারপাস বা আন্ডারপাস নির্মাণ সম্ভব কিনা তা যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি রেলক্রসিংগুলোকে স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনাও রয়েছে।’’
তিনি জানান, একটি নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে ট্রেন প্রবেশ করলেই ক্রসিংয়ের ব্যারিয়ার স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেমে যাবে, এমন প্রযুক্তি চালুর বিষয়ে কাজ চলছে।
রেল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট লেভেল ক্রসিং রয়েছে ২ হাজার ৮৫৬টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৬১টি অবৈধ। আবার ১ হাজার ৪৯৫টি বৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যে ৬৩২টিতেই নেই গেটম্যান।
সব মিলিয়ে অব্যবস্থাপনা, জনবল সংকট ও মানুষের অসচেতনতার সমন্বয়ে লেভেল ক্রসিংগুলো এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। কার্যকর ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান ছাড়া এই মৃত্যুমিছিল থামানো কঠিন বলেই মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।