কোটি টাকার যাত্রী ছাউনি কাদের জন‍্য? 

রাজধানীতে গণপরিবহনের শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং যাত্রীদের রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষা দিতে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে শতাধিক যাত্রী ছাউনি নির্মাণ করলেও তার সুফল মিলছে না। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, দখলদারিত্ব এবং বাস চালক ও যাত্রীদের অসচেতনতায় এসব স্থাপনা এখন প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। 

যাত্রী নেই, থামে না বাসও 

সরেজমিনে ঢাকা উত্তর (ডিএনসিসি) ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ যাত্রী ছাউনিতেই বাস থামছে না। যাত্রীরা ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়কেই বাসে ওঠানামা করছেন। শাহবাগ মোড়ের সামনে ডিএসসিসি নির্মিত একটি যাত্রী ছাউনিতে গিয়ে দেখা যায়, কোনও যাত্রী নেই; বরং সেখানে এক ভবঘুরে ঘুমিয়ে আছেন।

রাজধানীর শাহবাগ মোড়ের খানিকটা সামনেই পাঠক সমাবেশ কেন্দ্র অবস্থিত। তার সামনেই ডিএসসিসি নির্মিত একটি যাত্রী ছাউনি। গত শুক্রবার (৩ এপ্রিল) বিকালে সেই ছাউনিতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একজন ভবঘুরে শুয়ে আছেন। আশেপাশে তেমন কোনও যাত্রী নেই, এমনকি এ ছাউনির সামনে বাসও থামে না। সবাই বাসে ওঠার জন্য শাহবাগ মোড়ে থাকেন। 

সেই যাত্রী ছাউনির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জিহাদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ছুটির দিনে বই নিতে পাঠক সমাবেশে এসেছিলাম। বই নেওয়া শেষে ধানমন্ডি যাওয়ার উদ্দেশে বাসের জন্য বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু লক্ষ্য করলাম শাহবাগ মোড়ের সিগন্যাল ছাড়ার পরে সবগুলো বাস তাড়াহুড়ো করে চলে যাচ্ছে। কোনও বাসই ছাউনির সামনে থামছে না। অথচ এখানেই দাঁড়ানোর কথা।’’ 

এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, “সাধারণ যাত্রীরা যেমন নিয়ম মেনে যাত্রী ছাউনিতে দাঁড়ান না, তেমনি বাস চালকরাও যাত্রী ছাউনিতে বাস থামান না। চালকরা যেখানে সেখানে বাস থামিয়ে যাত্রী নেন। এর ফলে যানবাহনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এতে করে যানজট সৃষ্টি হয়। এ পুরো সিস্টেমটাকে বদলানো দরকার। একই সঙ্গে যাত্রী ছাউনিগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে।” 

দখল আর আবর্জনার স্তূপ 

অধিকাংশ যাত্রী ছাউনির সামনে এখন ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। কোথাও হকারদের পসরা, আবার কোথাও মাদকসেবীদের আস্তানা গড়ে উঠেছে। 

নগরবাসীর অভিযোগ, যেখানে যাত্রী ছাউনি দরকার, সেখানে নেই। আবার যেখানে ছাউনি আছে, সেখানে দাঁড়ানো বা বসার ব্যবস্থা নেই। যেগুলোতে বসার ব্যবস্থা আছে তাও আবার হকার, ভাসমান লোকজনের দখলে। 

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রায়হান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “যেখানে-সেখানে বাস থামার কারণে সড়কে দীর্ঘ যানজট দেখা দেয়। এর দায় যেমন সিটি করপোরেশনের তেমনি পুলিশের ব্যর্থতাও রয়েছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও রয়েছে সচেতনতার অভাব। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কার্যকর কোনও উদ্যোগ না থাকায় দীর্ঘদিনেও এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।” 

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ 

বাস চালকরা আবার দায় চাপাচ্ছেন যাত্রীদের ওপর। সদরঘাট থেকে সাভারগামী রুটের সাভার পরিবহনের চালক রাসেল বলেন, “যাত্রীরাই নিজেদের ইচ্ছেমতো যেখানে-সেখানে বাস থামাতে বলেন। বাসের ভেতরে থাকা যাত্রী হুটহাট বাস থামিয়ে নেমে যেতে চান। আবার যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে বাসে উঠতে চান। তাদের কথামতো না থামালে বা না ওঠালে আমাদের মারধরের শিকার হতে হয়।”  

অপরদিকে সিটি করপোরেশনের অবহেলার কারণেই যাত্রী ছাউনিগুলো অকার্যকর হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “সিটি করপোরেশনের আসলে শুধু বাজেট দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, কিন্তু এ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ করে না। সিটি করপোরেশনের অবহেলার কারণে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনা নষ্ট হয়ে যায়। এর দায় অবশ্যই সিটি করপোরেশনকে নিতে হবে।” 

ব্যয় ও পরিসংখ্যান 

তথ্যমতে, ঢাকা মহানগরীতে দুই সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে গত কয়েক বছরে ৭৯টি নতুন যাত্রী ছাউনি নির্মিত হয়। সংস্কার করা হয় পুরোনো আরও কয়েকটি যাত্রী ছাউনি। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) রয়েছে অন্তত ২৯টি যাত্রী ছাউনি। এর মধ্যে বিমানবন্দর সড়ক অংশের বনানী ও কাকলী প্রান্তে এবং কালসি মোড়ের যাত্রী ছাউনিগুলোতে রয়েছে বাস-বে। 

গড়ে ১২ লাখ টাকা করে এসব বাস-বে ও যাত্রী ছাউনি নির্মাণে উত্তর সিটি করপোরেশনের খরচ হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ৪১ যাত্রী ছাউনি। ডিএনসিসির তুলনায় আকার-আয়তনে কিছুটা ছোট এসব যাত্রী ছাউনি নির্মাণে প্রতিটিতে গড়ে ৭ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। 

এছাড়া ২০১৮ সালে বিমানবন্দর সড়কের দুপাশে ৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২টি দৃষ্টিনন্দন যাত্রী ছাউনি নির্মাণ করেছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ভিনাইল ওয়ার্ল্ড’। কিন্তু সঠিক তদারকির অভাবে এগুলোর বেশিরভাগই এখন শ্রীহীন। 

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য 

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “নগরে মানুষের তুলনায় যাত্রী ছাউনির সংখ্যা খুবই কম। আবার যে কয়েকটি যাত্রী ছাউনি আছে, তা নাগরিক সুরক্ষায় তেমন কোনও ভূমিকা রাখছে না। অথচ চলার পথে রোদ-বৃষ্টি থেকে বাঁচতে যাত্রী ছাউনি খুবই জরুরি। সঠিকভাবে তদারকির অভাবে অনেক যাত্রী ছাউনি দখল হয়ে গেছে। বিষয়টি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। 

ডিএনসিসির প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রাকিবুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বর্তমানে নতুন করে ছাউনি করার পরিকল্পনা না থাকলেও বিদ্যমানগুলো কীভাবে কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে সমন্বিত আলোচনার সুযোগ রয়েছে।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমাদের ৫৯টি যাত্রী ছাউনির মধ্যে কিছু অকার্যকর ও অবৈধ দখলে আছে। আমরা ফুটপাত দখলমুক্ত করার পাশাপাশি যাত্রী ছাউনিগুলোও উদ্ধারের চেষ্টা করছি। আমরা যাত্রী ছাউনির সামনে বাস স্টপেজ লেখা স্টিকারও লাগিয়েছি। তবে চালক ও যাত্রীদের সচেতনতা ছাড়া এই ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ সুফল পাওয়া কঠিন।”