কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা এবং তার দরবারে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
রবিবার (১২ এপ্রিল) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে তারা এই ঘটনার নিন্দা ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়,
আসক জানায়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত একটি পুরোনো ভিডিওকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে তা ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এ ঘটনার আর একটি উদ্বেগজনক দিক হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) মনে করে, বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করেছে। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে “আইনানুগ প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে কোনো ব্যক্তিকে জীবন বা ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না” বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। একইভাবে ৩১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের আইনের আশ্রয় লাভ ও আইনের সমান সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এ বাস্তবতায় কোনো অভিযোগ বা মতবিরোধের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সংঘবদ্ধ জনতার নামে এ ধরনের কর্মকাণ্ড কার্যত সংবিধানের সরাসরি লঙ্ঘন এবং আইনের শাসনের পরিপন্থি।
এ ধরনের নৃশংস হামলা ও হত্যাকাণ্ড রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অজ্ঞাত ইন্ধনে পরিকল্পিতভাবে মব তৈরি করে সুফি সাধক, মাজার ও ধর্মীয় আস্তানাগুলোর ওপর ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। সেসব ঘটনায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পিটিয়ে হত্যার মতো চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। সে সময় এসব সহিংসতা প্রতিরোধ ও বন্ধে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা আজকের বাস্তবতায় পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ব্যতীত একটি গণতান্ত্রিক সমাজে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কোনোভাবেই ‘মব’ এর নামে বা জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি মেনে নেওয়া যায় না; বরং এ ধরনের প্বণতা সমাজে ভয়, অস্থিরতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জোরালো আহ্বান জানাচ্ছে যে, কুষ্টিয়ার এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত সকলকে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হোক এবং তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের সহিংসতায় উৎসাহিত না হয়। একইসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক, বিভ্রান্তিকর বা বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট প্রচারের মাধ্যমে সহিংসতা উসকে দেওয়ার সঙ্গে জড়িতদেরও চিহ্নিত করে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) আরও মনে করে, ভবিষ্যতে এ ধরনের মব সহিংসতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং তৎপরতা জোরদার করা অপরিহার্য। ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে পুঁজি করে যাতে কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে, সে লক্ষ্যে প্রশাসনিক জবাবদিহি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।