নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কর্তৃক দেশের নদ-নদীর অবৈধ দখলদারের তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। হালনাগাদ তালিকা মোতাবেক সারা দেশে নদ-নদীর মোট ২১ হাজার ৯৮২ জন অবৈধ দখলদার রয়েছে।
বুধবার (২২ এপিল) জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানান তিনি।
মন্ত্রী জানান, দখলদারদের তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ এবং নদ-নদীর অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের কর্মপরিকল্পনা পাঠানোর জন্য সব জেলা প্রশাসককে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সারা দেশে নদ-নদীর অবৈধ দখলদারদের অবিলম্বে উচ্ছেদযোগ্য এরূপ তালিকা পাওয়া সাপেক্ষে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাতের (হাসনাত আবদুল্লাহ) তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা জানান।
হাসনাত আবদুল্লাহ তার প্রশ্নে বলেন, আদালতের রায় অনুযায়ী নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা হলেও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের তালিকাভুক্ত ৫ হাজার অবৈধ দখলদারের বিরুদ্ধে একটিও বড় উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়নি। সেক্ষেত্রে সরকার কী কী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে এবং তা মোকাবিলায় সরকার কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে?
জবাবে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘বাংলাদেশের নদ-নদীর তীরভূমি, ফোরশোর ও প্লাবনভূমিতে অবৈধ দখলসহ অবৈধ কাঠামো নির্মাণ, নানাবিধ অনিয়ম রোধকল্পে এবং নদী দূষণ প্রতিরোধে হাইকোর্টের রিট পিটিশন নম্বর ৩৫০৩/২০০৯-এর আদেশ অনুসরণে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন-২০১৩ অনুকূলে ২০১৪ সালের ৫ আগস্ট জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরবর্তীকালে হাইকোর্টের রিট পিটিশন নং-১৩৯৮৯/২০১৬ এ তুরাগ নদসহ দেশের সকল নদ-নদীকে জীবন্ত সত্তা এবং কমিশনকে সব নদ-নদীর আইনগত অভিভাবক ঘোষণা করা হয়েছে।
মন্ত্রী সংসদে জানান, সারা দেশে নদ-নদীর অবৈধ দখলদারদের তালিকা মোতাবেক স্থানীয় জেলা প্রশাসন, বিআইডব্লিউটিএ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতায় বিভিন্ন সময় অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। ইতোমধ্যে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কর্তৃক দেশের নদ-নদীর অবৈধ দখলদারের তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। হালনাগাদ তালিকা মোতাবেক সারা দেশে নদ-নদীর মোট ২১ হাজার ৯৮২ জন অবৈধ দখলদার রয়েছে। ওই তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশের জন্য এবং নদ-নদীর অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের কর্মপরিকল্পনা পাঠানোর জন্য সব জেলা প্রশাসককে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সারাদেশে নদ-নদীর অবৈধ দখলদারদের অবিলম্বে উচ্ছেদযোগ্য এরূপ তালিকা প্রাপ্তি সাপেক্ষে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
সরকারের চ্যালেঞ্জ
ক) জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ অনুযায়ী জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা না থাকায় নদ-নদী ও খালের অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
খ) হাইকোর্টের রিট পিটিশন নম্বর ৩৫০৩/২০০৯ তে প্রদত্ত রায় অনুযায়ী সিএস ও আরএস রেকর্ড এর ভিত্তিতে নদীর সীমানা নির্ধারণের নির্দেশনা রয়েছে। তবে সিএস ও আরএস রেকর্ড অনুযায়ী বাস্তবে নদী গতিপথ পরিবর্তন করে অনেক দূরে সরে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
গ) নদীর বিভিন্ন অবৈধ দখলের বিষয়ে হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালতে মামলা চলমান থাকায় অথবা অবৈধ দখল উচ্ছেদে আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় সেসব অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা সম্ভব হচ্ছে না।
ঘ) স্থানীয় প্রশাসনের প্রয়োজনীয় লোকবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকা এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ না থাকায় নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হয় না।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ
ক) জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ সংশোধনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে নদ-নদী দখল ও দূষণকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, পৃথক নদী আদালত প্রতিষ্ঠা, নদী দখল সংশ্লিষ্ট অভিযোগের তদন্ত পরিচালনা, মামলা দায়ের এবং তা তদারকির ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। আইনে মহামান্য হাইকোর্টের রায়ের আলোকে দেশের সব নদীকে ‘আইনি ব্যক্তি’ বা ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে নদ-নদীর আইনগত অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালনসহ এনফোর্সমেন্ট ক্ষমতা প্রদান করা হবে। প্রস্তাবিত আইনের খসড়া জনমত যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
খ) মাঠ প্রশাসন হতে প্রাপ্ত কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অবৈধ দখলদার বিরুদ্ধে অবিলম্বে উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
গ) উচ্ছেদ হওয়া জায়গা পুনরায় দখল ঠেকাতে উচ্ছেদকৃত স্থানে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ বা সীমানা পিলার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।