দেশজুড়ে ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা কমছেই না। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক বছরের মতো চলতি বছরও ধর্ষণের ঘটনা খুব একটা কমেনি। নারী, কিশোরীদের সঙ্গে পৈশাচিকতার শিকার হয়েছেন শিশুরাও। কঠোর আইন ও শাস্তির বিধান থাকলেও কেন এই জঘন্য অপরাধ কমছে না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়ের না করা এবং সামাজিক-নৈতিক অবক্ষয়; এই তিনটি বিষয় ধর্ষণ ঘটনা না কমার অন্যতম কারণ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। এর সঙ্গে সঙ্গে আইনের অপব্যবহার রোধেও জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে অধিকাংশই প্রকৃত ধর্ষণের ঘটনা নয়। বেশিরভাগ মামলার তদন্তে ভিন্ন চিত্র বেরিয়ে আসে। আর এ কারণে প্রকৃত অপরাধের ঘটনাতেও অনেক সময় তেমন একটা গুরুত্ব পায় না।
এই পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে সম্প্রতি ফেনীর একটি ধর্ষণ মামলার ঘটনায়। ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে ফেনীর পরশুরামে মক্তব শিক্ষক ও ইমাম মোজাফফর আহমদের (২৫) বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। পরে তাকে গ্রেফতারও করে পুলিশ। এই মামলায় এক মাস দুই দিন কারাভোগও করেন এই তরুণ। পরে আদালতের নির্দেশে সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। প্রথম ধাপে কিশোরীর ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষায় মোজাফফরের বিরুদ্ধে কোনও প্রমাণ মেলেনি। পরে কিশোরী ও তার সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানকে নিয়ে পুনরায় ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। তদন্তে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
আদালতে জমা দেওয়া পুলিশ তদন্ত রিপোর্টে উঠে এসেছে, ভুক্তভোগীর আপন বড় ভাই (২২) তাকে দীর্ঘদিন ধর্ষণ করে। পরিবার বিষয়টি আড়াল করতে ইমাম মোজাফফরের বিরুদ্ধে মামলা করে। গত বছরের ১৯ মে মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে।
নিশ্চয়ই এমন ঘটনা নিয়মিত নয়। তবে ধর্ষণের মতো ভয়াবহ ঘটনা প্রতিরোধে করা এই শক্ত আইনের অপব্যবহার যে হয় না, তাও নয়। পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সব ক্ষেত্রে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে, এমন ধারণা সঠিক নাও হতে পারে। অনেক সময় প্রেমের সম্পর্কের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের পর বিরোধ সৃষ্টি হলে ধর্ষণের মামলা হয়। তার দাবি, প্রকৃত ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ১০ শতাংশের মতো। তবে অভিযোগ পেলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে।’
আইনের অপব্যবহার থাকলেও ভয়াবহতা কমেনি
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মোট ৫ হাজার ৯৫৮টি মামলা হয়েছে। এপ্রিল মাসে দায়ের হয়েছে ২ হাজার ১১টি মামলা। মার্চে ছিল ১ হাজার ৪৮৫টি, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ১৮১টি এবং জানুয়ারিতে ১ হাজার ২৮১টি মামলা। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে মামলার সংখ্যা বেড়েছে। যদিও এপ্রিল মাসে মামলার সংখ্যা কিছুটা কম দেখা গেছে।
আর মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে অন্তত ১৬৫ শিশু। গত এপ্রিলে সারা দেশে ২৯৪ নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৬৮ জন। এপ্রিল মাসে মোট ৩১২টি সহিংসতার ঘটনা রেকর্ড হয়েছে। যা আগের মাসের তুলনায় ২৩টি বেশি। এর মধ্যে ৫৪টি ধর্ষণ ও ১৪টি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে। একই মাসে ৮৯ জন নারী ও শিশু হত্যার শিকার হন, যেখানে মার্চে এই সংখ্যা ছিল ৭৩ জন। গত ফেব্রুয়ারিতে অন্তত ২৩৬ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হন, যার মধ্যে ২৪টি ছিল শিশু ধর্ষণের ঘটনা।
আরেক মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৭৪৯ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ওই বছরের প্রথম চার মাসে ১২০ জনের বেশি নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০২৪ সালে দেশে মোট ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪০১ জন নারী ও শিশু। প্রথম চার মাসে শূন্য থেকে ১৮ বছর বয়সী ২২৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৮ জনে।
আর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ২২০ নারী-শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৫৮ জন, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার ১৭ জন এবং ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন তিন জন।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘এপ্রিল মাসে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সংবেদনশীল ও পরিবর্তনশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছে। নারী ও শিশু নির্যাতনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির ঝুঁকি রয়েছে।’
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন বিভাগের ডিসি লিজা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতি মাসেই শতাধিক ধর্ষণ মামলার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। গত মাসে ৮৮টি মামলার তদন্ত ও নিষ্পত্তি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ধর্ষণ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইন্টারনেটে অনিয়ন্ত্রিত বিচরণের কারণে একশ্রেণির মানুষ নীতি-নৈতিকতাবহির্ভূত কনটেন্ট ও পর্নোগ্রাফির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে। একইসঙ্গে নারীর প্রতি সম্মান ও মর্যাদাবোধের ঘাটতিও সহিংসতা বৃদ্ধির বড় কারণ।’’
তিনি বলেন, ‘ধর্ষণকে অনেক ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করার মানসিকতাও সমস্যা বাড়াচ্ছে। দ্রুত বিচার, অভিযুক্তদের আইনের আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগীর আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।’
তার মতে, ধর্ষণবিরোধী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং নারী-পুরুষকে সমান নাগরিক হিসেবে মূল্যায়নের মানসিকতা তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে অপরাধ প্রবণতা কমাতে।’