ঈদের আগে মহাসড়কে ডাকাত আতঙ্ক, টার্গেটে গরুবাহী ট্রাক

ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশু নিয়ে ঢাকামুখী ব্যবসায়ীরা। এরইমধ্যে মহাসড়কে অপতৎপড়তা বাড়িয়েছে সংঘবদ্ধ ডাকাতচক্র। ব্যারিকেড বসিয়ে অস্ত্রের মুখে কয়েক মিনিটের তাণ্ডবে উধাও হয়ে যায় গরুবাহী ট্রাক নিয়ে। দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে এমন গরু লুট, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে যাত্রী, ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ ঈদযাত্রা নিয়েও দেখা দিয়েছে শঙ্কা। প্রশ্ন উঠছে, ঈদযাত্রার আগে আবারও কি মহাসড়ক ডাকাতদের দখলে চলে যাচ্ছে? তবে হাইওয়ে পুলিশ বলছে, মহাসড়কের নিরাপত্তার জন্য সবধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

গত ৭ মে ভোরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম এলাকায় ব্যারিকেড বসিয়ে গরুবাহী একটি ট্রাকে হামলা চালায় প্রায় ১০ জনের সশস্ত্র ডাকাত দল। তারা চালক আকরাম হোসেনকে ছুরিকাঘাত করে ট্রাকের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে ট্রাকটি আঞ্চলিক সড়কের ফেলনা মোল্লা বাড়ি এলাকায় নিয়ে চালক ও হেলপারকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রেখে ১০টি গরু লুট করে নিজেদের পিকআপে তুলে পালিয়ে যায়। পরদিন সকালে আশপাশের লোকজন আহত চালক ও তার সহকারীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।

এর আগে গত ১৭ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ-বগুড়া মহাসড়কের সলঙ্গা এলাকায় উত্তরবঙ্গ থেকে কেনা ১৪টি ষাঁড় গরুসহ একটি ট্রাক ছিনতাই হয়। অস্ত্রের মুখে চালক, হেলপার ও রাখালকে জিম্মি করে ডাকাতরা ট্রাক নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে আশুলিয়া এলাকা থেকে এই চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা জানায়, লুট করা গরু জবাই করে তারা রাজধানীর বিভিন্ন সুপারশপে মাংস সরবরাহ করতো। গরুগুলো ছিল চট্টগ্রামের বাসিন্দা আমানুল্লাহর।

এছাড়াও ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-রাজশাহী, ঢাকা-রংপুর, ফরিদপুর ও মানিকগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে মাঝেমধ্যেই সংঘবদ্ধ ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক।

গত ২৪ এপ্রিল সরকারি প্রশিক্ষণ শেষে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের হাতে নিহত হন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী (৩৫)। পরদিন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি এলাকা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেফতারের পর ঘটনার রহস্য জানতে পারে র‌্যাব। 

এর আগে মার্চ মাসের শেষদিকে কুমিল্লা–চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে গাছ ফেলে পথরোধ করে এক ব্যবসায়ীর প্রাইভেট কার থামায় ১০ থেকে ১২ জনের একটি ডাকাত দল। ভুক্তভোগী জহুরুল হক যমুনা ও সেনা এলপি গ্যাসের স্থানীয় ডিলার। পরে দেশীয় অস্ত্রের মুখে গাড়ির গ্লাস ভেঙে তাকে ও তার ব্যক্তিগত গাড়ির চালক সাইফুল ইসলামকে জিম্মি করা হয়। এ সময় নগদ প্রায় সোয়া ৯ লাখ টাকা ও চারটি স্মার্টফোন ছিনিয়ে নিয়ে যায় ডাকাতরা। ঘটনার তদন্তে নেমে সম্প্রতি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) দুজনকে গ্রেফতার করেছে এবং ভুক্তভোগীর একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করেছে।

এসব ঘটনায় মহাসড়কের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে পশু ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে। তবে হাইওয়ে পুলিশ বলছে, এবার ঈদে পশুবাহী ট্রাক চলাচলে ‘এসকর্ট সার্ভিস’ দেওয়া হবে। এছাড়া মহাসড়কের নিরাপত্তায় কুইক রেসপন্স টিমও থাকবে। সেইসঙ্গে পেট্রলিংও জোরদার করা হবে। ইতোমধ্যে ১ হাজার নতুন জনবল চাওয়া হয়েছে। দ্রুতই এই জনবল হাইওয়ে পুলিশে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

মহাসড়কের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে ইতোমধ্যে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। বৈঠকে মালিক-শ্রমিকরা পুলিশকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। মহাসড়কে কোরবানির পশুবাহী ও চামড়াবাহী ট্রাকে ডাকাতি ঠেকাতে বিশেষ ‘এসকর্ট’ সেবা চালু করা হবে। পাশাপাশি যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কমিউনিটি পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

ঈদুল আজহা উপলক্ষে সারা দেশে সম্ভাব্য যানজটপ্রবণ ৯৪টি গুরুত্বপূর্ণ স্পট চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। এর মধ্যে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সাতটি, ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে ২৫টি, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে সাতটি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ২১টি, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ২৫টি, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কে আটটি এবং ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে একটি স্পট রয়েছে।

হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (অপারেশন) মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, ঈদযাত্রায় মহাসড়কে ডাকাতি ও ছিনতাই প্রতিরোধে টহল ও চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে। কোরবানির পশুবাহী ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনকে দলবদ্ধভাবে ‘এসকর্ট’ দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একইভাবে পশুর চামড়াবাহী যানবাহনেও দেওয়া হবে এসকর্ট সুবিধা।

তিনি জানান, হাইওয়ে পুলিশের অধীনে থাকা ৮০টি থানা ও ফাঁড়িকে টহল জোরদারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, ততই বাড়ানো হবে পেট্রোলিং। কোনো ঘটনা ঘটলে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে প্রস্তুত থাকবে পুলিশ।

মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। চন্দ্রা সড়ককেও ক্যামেরা নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় অন্যান্য মহাসড়কেও পর্যায়ক্রমে সিসিটিভি স্থাপনের কাজ চলছে। পাশাপাশি হাইওয়ের প্রতিটি অঞ্চলে ড্রোন নজরদারির ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে।

মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পাশের গ্রামীণ সড়ক থেকে হঠাৎ করে থ্রি-হুইলার মহাসড়কে উঠে পড়ায় নিয়ন্ত্রণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তবে সামনে পেলেই এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ঈদযাত্রায় যেন ঝুঁকিপূর্ণ বা আনফিট বাস চলাচল না করে, সে জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। আনফিট বাস জব্দের পর সংরক্ষণের জায়গা সংকট থাকায় মালিকদের আগেই নোটিস দেওয়ার জন্য বিআরটিএকে বলা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, বিভিন্ন ইউনিট থেকে হাইওয়ে পুলিশে অতিরিক্ত এক হাজার জনবল সংযুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। এসব জনবল যুক্ত হলে দেশের প্রায় সব মহাসড়কই পুলিশি নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হবে।