‘জলবায়ু সংকট নিরসনে দরকার প্রতিষ্ঠানিক সমন্বিত উদ্যোগ। এক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদফতরের সীমাবদ্ধতা যাচাই করে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর আন্তঃউদ্যোগ নেওয়া জরুরি।’
বৃহস্পতিবার (২১মে) দুপুরে রাজধানীর গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে খ্রিস্টিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশ (সিসিডিবি) নামক উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে ‘জলবায়ু সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বিষয়ক জাতীয় পরামর্শ’ শীর্ষক সভায় এমন অভিমত ব্যক্ত করেন বক্তারা।
অনুষ্ঠানে জলবায়ু নিয়ে কর্মরত ৫০টির বেশি সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বক্তব্য রাখেন সিসিডিবির প্রধান নির্বাহী জুলিয়েট কেয়া মালাকার, জলবায়ু গবেষক ড. হাসিব মোহাম্মদ ইরফানুল্লাহ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ইউনিটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. ইকবাল কবীর এবং কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর মি. মণীষ আগারওয়াল।
কর্মসূচির মূল প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. আহসান উদ্দিন আহমেদ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের জয়েন্ট সেক্রেটারি ধরিত্রী কুমার সাহা, কর্ডএইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডাউয়ে ডিকস্ট্রা এবং সিসিডিবির নির্বাহী পরিচালক।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই সিসিডিবির প্রধান নির্বাহী জুলিয়েট কেয়া মালাকার সংস্থাটির জলবায়ু সহনশীল ও সক্ষম কমিউনিটি গড়ে তোলার লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে কাজ করার বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “১৯৭২ সালে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পথ শুরু করেছে সিসিডিবি। ২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কাজ করছে এবং বর্তমানে দেশের ২৯টি জেলায় ১ লক্ষাধিক পরিবারের সঙ্গে কাজ পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি কমিউনিটি রেজিলিয়েন্স, গবেষণা, অ্যাডভোকেসি, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাসে বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। জলবায়ু সহনশীল কৃষি, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও দুর্যোগ সহনশীল অবকাঠামোর মাধ্যমে হাজারো ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। সিসিডিবির কার্বন এমিশন রিডাকশন প্রকল্পের আওতায় ২,৭৬৫টি উন্নত চুলা ব্যবহারের ফলে প্রতি পরিবার বছরে প্রায় ৩ দশমিক ২০ টন কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন কমাতে সক্ষম হচ্ছে। এছাড়া ক্লাইমেট সেন্টার ও ক্লাইমেট পার্কের মাধ্যমে স্থানীয় থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু শিক্ষা, উদ্ভাবন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।”
জলবায়ু গবেষক ড. হাসিব মোহাম্মদ ইরফানুল্লাহ তার বক্তব্যে বাংলাদেশের জলবায়ুর সংকট বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে ডেল্টা প্ল্যান, প্রস্পেটিভ প্ল্যান, ন্যাশনাল প্ল্যান, জেন্ডার একশন প্ল্যান এবং সম্প্রতি মিটিগেশন প্ল্যানসহ জলবায়ু পরিবর্তনকে চিহ্নিত করে নানাবিধ পরিকল্পনা ও নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে, কিন্ত বাস্তবায়নে তা পরিপূর্ণভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না।”
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (এনএপি ২০২৩–২০৫০) বাস্তবায়নে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন, যেখানে বার্ষিক অর্থায়নের চাহিদা প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ অর্থবছরে জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের মধ্যে মাত্র ৬ দশমিক ২২ শতাংশ অর্থ সক্ষমতা উন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণে বরাদ্দ হয়েছে, যা আরও বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি তিনি জলবায়ু সংকট নিরসনে নতুন ধারণা হিসেবে ‘ন্যাচারাল বেইজড সলিউশন’ নিয়ে কাজ করার জন্য সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থার যৌথ সমন্বয়ের প্রতি গুরুত্ব দেন ।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন ইউনিটের সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. ইকবাল কবীর বলেন, “বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডে জলবায়ু পরিবর্তন এর জন্য ৪৭০০ কোটি টাকার বরাদ্দের মধ্যে ০.০৩ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে জনস্বাস্থ্য খাতে। অথচ জলবায়ু সংকটের ওপর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে জনস্বাস্থ্যেই।” তাই এই খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি।
কনসার্ন ওয়ার্ল্ড ওয়াইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর মি. মণীষ আগারওয়াল উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনে সমন্বিত প্রচেষ্টার কথা বলেন। পাশাপাশি তিনি এভিডেন্স বেইজড প্রোগ্রামের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন।
কর্মসূচির শেষে সিসিডিবির দশ বছর ধরে নিয়মিতভাবে চলে আসা আন্তর্জাতিক মানের জলবায়ু প্রশিক্ষণের ৮ম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট প্রদান করা হয় এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জলবায়ু, কৃষি গবেষক, শিক্ষক এবং উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিদের একটি এলামনাই নেটওয়ার্ক উদ্বোধন করা হয়।