মাকে ‘অস্বীকার’ করেছিলেন যুগ্ম সচিব ছেলে, পরে স্বীকারোক্তি

রাজধানীর মিরপুরে একা বাসায় থাকা ৭৫ বছর বয়সী নুরজাহান বেগমের পচাগলা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের মা হয়েও কেন এমন পরিণতি হলো, তা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। এর মধ্যেই সামনে এসেছে নতুন তথ্য। পুলিশের ঝামেলা এড়াতে প্রথমে নুরজাহান বেগমকে নিজের মা হিসেবে অস্বীকার করেছিলেন সরকারের যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান। পরে তিনি বিষয়টি স্বীকার করেন বলে জানিয়েছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বুধবার (৩ জুন) সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কমডোর মো. শফিকুল ইসলাম সরকার

তিনি বলেন, ‘আনিসুর রহমান প্রথমে বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন। পরে তিনি স্বীকার করেন, নুরজাহান বেগম তার মা ।’

যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহ

গত ৩১ মে রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসির জানান, বৃদ্ধা মেয়ের বাসাতেই থাকতেন। যে কক্ষে তিনি ছিলেন সেটি ছিল অস্বাস্থ্যকর ও অগোছালো। দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় মরদেহে পচন ধরে এবং পোকা পড়ে যায়। বাসা থেকে দুর্গন্ধ বের হলে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন।

তিনি বলেন, এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।

কারা এই সন্তানরা

ঘটনাটি আলোচনায় আসার অন্যতম কারণ নুরজাহান বেগমের সন্তানদের সামাজিক ও পেশাগত পরিচয়।

বড় ছেলে ড. এ কে এম আনিসুর রহমান সরকারের একজন যুগ্ম সচিব। তিনি বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

দ্বিতীয় ছেলে ড. এ কে এম আশিকুর রহমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক। তিনি কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টা থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন।

মেয়ে ফাতিমা নাসরিন সুলতানা মিরপুরের একটি স্কুলের শিক্ষিকা। ছোট ছেলে কে এম আতিকুর রহমান কানাডায় বসবাস করেন।

স্থানীয়দের দাবি, দুই ছেলে দীর্ঘদিন ধরে মায়ের সঙ্গে আলাদা থাকতেন এবং নিয়মিত যোগাযোগও ছিল না।

পদ হারালেন আনিসুর রহমান

এ ঘটনার পর ড. এ কে এম আনিসুর রহমানকে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল ও উন্নয়ন) পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছে সরকার।

বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনে তাকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত (ওএসডি) করা হয়।

সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন

পরিবারের সদস্যরা উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও একজন মায়ের এমন নিঃসঙ্গ মৃত্যু সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের প্রশ্ন সামনে এনেছে বলে মনে করেন সমাজবিজ্ঞানীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, ‘অনেকেই ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিগত উন্নতির পেছনে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন যে মা-বাবার প্রতি দায়িত্ববোধের জায়গাটি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। স্বার্থ, পদোন্নতি, ক্যারিয়ার ও করপোরেট সংস্কৃতির প্রভাবে মানুষ ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।’

তিনি বলেন, সমাজে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

হাইকোর্টে রিট

এদিকে, নুরজাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে।

বুধবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শরীফ সরকার জনস্বার্থে এ রিট করেন। রিটে ৭৫ বছর বয়সী এই নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা তদন্তের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। রিটের পক্ষে রয়েছেন ব্যারিস্টার এইচ এম সানজিদ সিদ্দিকী।