গত একবছরে সবচেয়ে বেশি গাছ কাটা হয়েছে রাজশাহীতে। ২০২৫ সালের মে থেকে ২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত একবছরে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ ২৩ হাজার ৪১টি ও কক্সবাজারে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১ হাজার বৃক্ষনিধনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে গবেষণায় জানা গেছে। তবে একবছরে দেশে ৫২ হাজার ৩৭৫টি বৃক্ষনিধনের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। যা ২০২৪-২৫ বছরের তুলনায় ৭১ দশমিক ২ শতাংশ কম। মূলত দেশে বড় বড় নির্মাণ ও উন্নয়ন প্রকল্প আপাতত বন্ধ অথবা ধীরগতিতে চলায় গাছ কাটার হার কমেছে।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) পরিবেশ অধিদফতর মিলনায়তনে ‘গাছনিধন মিডিয়া মনিটরিং ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন’ প্রকাশ অনুষ্ঠানে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) কোষাধ্যক্ষ আমিনুর রসুল বাবুল এসব তথ্য তুলে ধরেন। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি), গ্রীন ভয়েস, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন, ব্রাইটার্স এবং ন্যাশনাল ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র।
গবেষণায় দেশের ২৯ জেলায় গাছ কাটার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গত এক বছরে গড়ে প্রতি মাসে ৪ হাজার ৩৬৫টি গাছ কাটা পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গাছ কাটা হয়েছে রাজশাহী জেলায়— ২৩ হাজার ৪১টি। এরপরই ১১ হাজার গাছ কাটা পড়েছে কক্সবাজারে, সুনামগঞ্জে ৬ হাজার ৪০৯ এবং চট্টগ্রামে ৫ হাজার ১০৩টি। অপরদিকে সবচেয়ে কম গাছ কাটা হয়েছে মাগুরা ও মাদারীপুর জেলায়। এই দুই জেলায় মাত্র ১টি করে গাছ কাটার খবর পাওয়া গেছে।
তিনি ৯ দফা সুপারিশ তুলে ধরে বলেন, “বন আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় বন ও বৃক্ষনিধন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। টেকসই কৃষি ও কৃষি বনায়ন সম্প্রসারণ করতে হবে। নগর পরিকল্পনায় সবুজ অবকাঠামো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করতে হবে। বনের ওপর আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। বিকল্প জীবিকা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং পরিবেশ সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।”
অনুষ্ঠানে পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান বলেন, “বৃক্ষনিধন ও বন উজাড়ের কারণে মাটিক্ষয়, ভূমিধস, জীববৈচিত্র্যের ধ্বংস, প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট এবং পরিবেশগত অবক্ষয় ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে বনভূমি সংকুচিত হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। তবে আশার কথা হচ্ছে, এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ছে এবং এক বছরে বৃক্ষনিধন ৭১ শতাংশ কমেছে। সরকার বৃক্ষনিধন বন্ধের পাশাপাশি ২৫ কোটি বৃক্ষরোপনের উদ্যোগ নিয়েছে।”
জাতীয় বন ও বৃক্ষনিধন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক হারে গাছ কাটা ও বন উজাড়ের ঘটনা ঘটছে। উন্নয়ন প্রকল্প, নগরায়ণ, শিল্পায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, কৃষিজমির সম্প্রসারণ এবং কাঠ ও জ্বালানির ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বনভূমি ও বৃক্ষআচ্ছাদনের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ফলে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
বৃক্ষনিধন বন্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক। তিনি বলেন, “বৃক্ষনিধন বন্ধসহ পরিবেশ সুরক্ষায় আইন ও নীতিমালা থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে না। বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন কার্যকর করা গেলে বৃক্ষনিধন অনেকটাই কমে আসবে।” পরিবেশগত অপরাধ দমনে ইউনিয়ন পর্যায়ে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বৃক্ষরোপনের পাশাপাশি তা সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান মোস্তফা কামাল মজুমদার। তিনি বলেন, “নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরকার গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে, এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। তবে কোথায় কোন গাছ লাগাতে হবে, সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে।” পরিবেশ আদালত আইনসহ সকল আইন ও নীতিমালা কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি।