বিচারিক আদালতে (নিম্ন আদালত) আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হওয়ার পরও আইনি দীর্ঘসূত্রতা ও উচ্চ আদালতে আপিল নিষ্পত্তির ধীরগতির কারণে মাগুরার চাঞ্চল্যকর শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি হাইকোর্টে ঝুলে আছে। মামলার আদি বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের দৃষ্টান্তমূলক তৎপরতা দেখা গেলেও উচ্চ আদালতে আসামির আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানির দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে চূড়ান্ত ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ভুক্তভোগীর পরিবার।
সেই হত্যাকাণ্ড ও দ্রুততম বিচার
২০২৫ সালের ৫ মার্চ মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার জারিয়া গ্রামে বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে নির্মম ও বীভৎস নির্যাতনের শিকার হয় আট বছরের শিশু আছিয়া। গুরুতর ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে দ্রুত ঢাকায় এনে হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই পাশবিক ঘটনা সে সময় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় তোলে।
জনমনে তৈরি হওয়া ক্ষোভের মুখে আলোচিত এই মামলায় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এক মাসের মধ্যে মামলার বিচার কাজ শেষ করার সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন। সেই অনুযায়ী মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। মাত্র ২১ দিনের (১৩ কার্যদিবস) ম্যারাথন শুনানি শেষে ২০২৫ সালের ১৭ মে মামলার ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করা হয়। আদালত ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ও প্রধান আসামি হিটু শেখকে (শিশুটির বড় বোনের শ্বশুর) সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন। রায়ের মাত্র চার দিনের মাথায় আইনগত নিয়ম অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য (ডেথ রেফারেন্স) মামলার সমস্ত নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠানো হয়।
হাইকোর্টের মামলার জট ও ৬-৭ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা
অধঃস্তন আদালতে রেকর্ড গড়ে রায় ঘোষণার পর এক বছরেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও হাইকোর্টে মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আসামির আপিল শুনানি আজও শুরু করা সম্ভব হয়নি। এর ফলে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আইনি নিয়ম অনুযায়ী প্রধান আসামির দণ্ড কার্যকর করা যাচ্ছে না।
সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট সেকশন সূত্র বলছে, উচ্চ আদালতে বিচারাধীন অসংখ্য ফৌজদারি মামলা ও ডেথ রেফারেন্সের পাহাড়সম চাপের কারণে স্বাভাবিকভাবেই নতুন মামলার শুনানির প্রক্রিয়াটি ধীরগতির হয়ে পড়েছে। বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগে ২০১৮-২০১৯ সালের ডেথ রেফারেন্সের মামলাগুলোর শুনানি চলছে। ফলে সাল অনুযায়ী যদি ধারাবাহিকভাবে এই মামলার শুনানি করতে হয়, তবে আছিয়া হত্যা মামলার শুনানির নম্বর আসতে আরও প্রায় ৬ থেকে ৭ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এদিকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে উচ্চ আদালতের বারান্দায় মামলার নথিপত্র ঘুরপাক খাওয়ায় চরম হতাশ ও ক্ষুব্ধ আছিয়ার পরিবার। ভুক্তভোগীর মা আয়েশা খাতুন আক্ষেপ করে জানান, অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তার শান্তি নেই।
আইনি প্রক্রিয়া ও বর্তমান অবস্থা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আসামিপক্ষের এক আইনজীবী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমরা আপিল ফাইল করেছি। ২০২৫ সালের ১ জুলাই হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ আসামির আপিল শুনানির জন্য গ্রহন করে তার অর্থদণ্ড স্থগিতের আদেশ দিয়েছেন। নিয়ম অনুসারে এখন সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট সেকশন থেকে মামলার পেপারবুক প্রস্তুত করা হবে। এরপর মামলাটি শুনানিতে উঠবে।”