যেভাবে তিনি হয়ে উঠলেন বিশ্বের প্রথম নারী আলোকচিত্রী

ভিক্টোরিয়ার আমলে নানা ক্ষেত্রে উন্নতির কথা বলা হলেও সেই সময়টি নিয়ে ইতিহাসে বিতর্কও রয়েছে। অনেক ইতিহাসবিদ কিছু সংস্কার ও অগ্রগতির জন্য রানীর প্রশংসা করলেও নারীর অবস্থান ছিল তখনও সীমাবদ্ধতার ভেতরেই। রাষ্ট্রপ্রধান একজন নারী হওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশ সমাজ নারীদের পূর্ণ স্বাধীনতা স্বীকার করেনি।

সে সময় বিয়ের পর একজন নারী তার নিজের উপার্জন, ব্যক্তিগত সম্পত্তি কিংবা স্থাবর সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাতেন। আইন অনুযায়ী স্বামীই হয়ে যেতেন স্ত্রীর সম্পদের মালিক। এমনকি স্ত্রীর পক্ষে স্বামীর অনুমতি ছাড়া কোনও চুক্তিতে স্বাক্ষর করা বা উইল তৈরি করাও সম্ভব ছিল না।

এই বাস্তবতা থেকে সহজেই বোঝা যায়, রানীর জন্মের প্রায় দুই দশক আগের ব্রিটিশ সমাজে নারীর অবস্থান কতটা সীমাবদ্ধ ছিল। ঠিক সেই সময়েই জন্ম নেন আনা অ্যাটকিনস—যিনি পরবর্তীতে ইতিহাসে নিজের কাজের মাধ্যমে নারীর সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।

ক্যামেরাহীন ফটোগ্রাফির অগ্রদূত আনা অ্যাটকিনসের আলোকচিত্র

নারী যখন সমাজের চার দেয়ালের ভেতরে সীমাবদ্ধ, তখনই তিনি আলো আর বিজ্ঞানের মেলবন্ধনে তৈরি করেছিলেন এক নতুন ইতিহাস। ক্যামেরা ছাড়াই ছবি তুলে তিনি শুধু আলোকচিত্রের জগতে নিজের নাম লেখাননি, হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বের প্রথম নারী আলোকচিত্রী।

ঘরে-বাইরে যেখানেই ফটোগ্রাফির ইতিহাস চর্চা হয় সেখানে প্রথমেই শোনা যায় একদল পুরুষের নাম। ফটোগ্রাফিতে যেন নারীদের কোনও ভূমিকা নেই। নারী আলোকচিত্রীদের নাম একেবারেই না নিলে বাজে দেখায়, তাই মাঝেসাঝে দু-একজনের নাম নেওয়া হয়। এমন প্রেক্ষাপটে অ্যানা অ্যাটকিনসের নামটিও খুব একটা শোনা যায় না। যদিও তিনি বিশ্বের প্রথম নারী আলোকচিত্রী হিসেবে বিবেচিত।

তিনি যখন আলোচিত্রচর্চা শুরু করেন, তখন ফরাসি উদ্ভাবক লুই ড্যাগুয়ারের ‘ড্যাগুয়েরোটাইপ’ ক্যামেরা নিয়ে আলোচনাটা সবে শুরু হয়েছে। কিন্তু অ্যানা প্রধানত ক্যামেরা ছাড়াই ফটোগ্রাফি করেছেন! কীভাবে? সে আলাপে আসছি।

শৈবালচিত্রে বিপ্লব ঘটান নারী আলোকচিত্রী আনা

অ্যানার জন্ম ১৭৯৯ সালে ইংল্যান্ডের কেন্টে। সে সময় ব্রিটিশ সমাজে নারীদের শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা বা শিল্পকলায় অংশগ্রহণ ছিল খুবই সীমিত। অ্যানার ভাগ্য ভালোই বলতে হয়। কারণ তিনি জন্ম নিলেন জন জর্জ চিলড্রেনের ঘরে। তার জীবনে বড় পরিবর্তন আসে বাবা জন জর্জ চিলড্রেনের কারণেই। চিলড্রেন ছিলেন সেসময়ের একজন খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, রয়াল সোসাইটির প্রভাবশালী সদস্য, ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কর্মী এবং রয়াল এনটোমোলজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডনের প্রথম সভাপতি।

মেধাবী এই মানুষটি নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি জানতেন, শিক্ষাই নারী-মুক্তির প্রধান হাতিয়ার। নারী শিক্ষার প্রসার তিনি তার ঘর থেকেই শুরু করেছিলেন। কন্যাকে পড়ালেন বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য, শিল্পকলা।

আনা অ্যাটকিনসের সায়ানোটাইপ বিপ্লব

অ্যানার মা তাকে জন্ম দিতে গিয়েই মারা যান। তাই মেয়ের প্রতি বাবা চিলড্রেনের মমতা ছিল একটু বেশিই। সেসময় নারীর নানা বিষয় নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করার সুযোগ নেই বললেই চলে। তবে অ্যানা পেলেন সেই সুযোগ।

বাবার সঙ্গে কাজ করতে করতে অ্যানা একজন পাকা চিত্রশিল্পী হয়ে ওঠেন। অল্প বয়সেই বৈজ্ঞানিকভাবে নিখুঁত—এমন ২৫৬টি স্কেচ করে ফেলেন। ছবিগুলো তার বাবার ‘জেনেরা অব শেলস’ বইয়ের ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত হয়েছিল। জলরং ও গ্রাফাইটে আঁকা ছবিগুলো এখন লন্ডনের নেচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।

১৮২৫ সালে তিনি জন পেলি অ্যাটকিনসকে বিয়ে করেন। ১৮৩০ সালের তিরিশের দশকে নিজের উদ্ভিদ-সংগ্রহশালা গড়ে তোলেন। তার সেই সংগ্রহ ১৮৬৫ সালে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে দান করা হয়।

নীল কাগজে ফুটিয়ে তোলেন নিজের প্রতিভা

অ্যানা ক্যামেরা ব্যবহার করতেন না—তা নয়। তিনি প্রথম ক্যামেরা পান ১৮৪১ সালে। কিন্তু ক্যামেরায় যেসব ছবি তিনি তুলেছিলেন তার একটির সন্ধানও আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তার জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত ছবিগুলো ক্যামেরা ছাড়াই তোলা। এজন্য তিনি কৃতজ্ঞ ফটোগ্রাফির অন্যতম পথিকৃৎ উইলিয়াম হেনরি ফক্স ট্যালবটের কাছে।

ট্যালবট ১৮৩৯ সালে এমন এক পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেললেন—যে পদ্ধতিতে আলোক-সংবেদনশীল কাগজের ওপর বস্তু রেখে সূর্যের আলোর সাহায্যে প্রতিবিম্ব তুলে নেওয়া যেত। ক্যামেরার মতো কোনও বস্তুর প্রয়োজন হতো না। এই পদ্ধতি ‘ফটোজেনিক ড্রইং’ নামে পরিচিতি পায়। একই সালে কিন্তু ফ্রান্সে ড্যাগুয়েরোটাইপ ক্যামেরা জনপরিসরে চলে এসেছিল।

যাহোক, অ্যানার বাবা চিলড্রেন ট্যালবটের এই নতুন আবিষ্কারের সঙ্গে কন্যাকে পরিচয় করিয়ে দেন। অ্যানার ছিল উদ্ভিদ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানের প্রতি দুর্বলতা। ফটোজেনিক ড্রইং পদ্ধতিতে তোলা উদ্ভিদের ছবিগুলো এখন অনুধাবনযোগ্য। ছবিগুলো এখনও একই সঙ্গে শৈল্পিক ও বৈজ্ঞানিক।        

বিজ্ঞানের আলোয় গড়া নারী আনার অসাধারণ আলোকচিত্র      

অ্যানার ফটোগ্রাফিতে আরও একটি বিশেষ মাত্রা যুক্ত হয় ১৮৪২ সালে। সে বছর অ্যানার বন্ধু বিজ্ঞানী স্যার জন হার্শেল উদ্ভাবন করলেন ‘সায়ানোটাইপ’ পদ্ধতি। ওই পদ্ধতিতে কাগজে রাসায়নিক মিশ্রণের (ফেরিক সল্ট) পরত দেওয়া হতো। তারপর সেই কাগজে কোনও বস্তু রেখে আলোর সংস্পর্শে ১০ থেকে ৪০ মিনিট রাখলে সেই বস্তুর প্রতিবিম্ব (সিলুয়েট) ছাপা কাগজে ফুটে উঠতো।

এখানেই শেষ নয়, জাদুটা হয় কাগজটি পানি দিয়ে ধোয়ার পর। ধোয়া শেষে দেখা যেত কাগজটি নীল আর অবয়বটি সাদা হয়ে গেছে! যেন সুরিয়্যালিস্টিক শিল্পকর্ম! সেসময় অন্য আলোকচিত্র-পদ্ধতির চেয়ে সায়ানোটাইপ ছিল বেশ সস্তা। নকশার অনুলিপি তৈরি করতে স্থপতি ও প্রকৌশলীরা ব্যাপকভাবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করতেন। এ কারণেই পদ্ধতিটি পরে ‘ব্লুপ্রিন্ট’ নামে খ্যাতি পায়।

এটি যেমন অ্যানার ফটোগ্রাফিকে সমৃদ্ধ করলো, তার কাজের মাধ্যমে এই পদ্ধতিও অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়। তিনি শুকনো শৈবাল, সামুদ্রিক উদ্ভিদ ও বিভিন্ন উদ্ভিদ-নমুনা সরাসরি আলোক-সংবেদনশীল কাগজের ওপর রেখে আলোর সাহায্যে ছাপচিত্র তৈরি করতেন।

এই যে ক্যামেরা ছাড়া ছবি—এখন এই পদ্ধতিকে ‘ফটোগ্রাম’ বলা হয়। সেসময় শৈবালের মতো অতি ক্ষুদ্র সাবজেক্টের সঠিক ছবি তোলা ছিল ভীষণ কঠিন। অ্যানা ‘সায়ানোটাইপ’কে সমাধান হিসেবে দেখেছিলেন।

এভাবে বহু ছবি তোলার পর ১৮৪৩ সালে তিনি শুরু করলেন তার সবচেয়ে বিখ্যাত প্রকল্প—‘ফটোগ্রাফস অব ব্রিটিশ অ্যালজি: সায়ানোটাইপ ইমপ্রেশনস’ (ব্রিটেনের শৈবালচিত্র: সায়ানোটাইপ পদ্ধতিতে তৈরি ছাপচিত্র)। এটি ছিল ব্রিটেনে পাওয়া যায় এমন বহু শৈবালের আলোকচিত্র নিয়ে একটি বই। শুধু উদ্ভিদবিজ্ঞানের দিক থেকেই বইটি গুরুত্বপূর্ণ নয়—শিল্প, বিজ্ঞান ও ফটোগ্রাফির ইতিহাসেও এক যুগান্তকারী কাজ। অনেক ইতিহাসবিদ ও গবেষকের মতে এটিই বিশ্বের প্রথম ফটোবুক।

বইটি কোনও ছাপাখানা থেকে বের হয়নি। পুরো বইটি অ্যানা নিজের হাতে তৈরি করেছিলেন। ১৮৪৩ থেকে ১৮৫৩ সালের মধ্যে তিনি সায়ানোটাইপ চিত্রের প্রায় ১০ হাজার প্রতিলিপি তৈরি করেছিলেন। বইটিতে ছিল ৪১১টি ছবি। প্রতিটি ছবির বৈজ্ঞানিক নাম অ্যানা অ্যাটকিনস নিজে লিখতেন। এখনও ছবিগুলো দেখলে মনে হয়, খুব পুরনো নয়। অথচ এগুলো তৈরি হয়েছিল প্রায় দুইশ’ বছর আগে।

নীল ব্যাকগ্রাউন্ডে সাবজেক্ট হিসেবে উদ্ভিদের সাদা রঙের অবয়ব; কোনোটি তুষারকণার মতো, কোনোটি সামুদ্রিক প্রাণীর মতো, আবার কোনোটি বিমূর্ত শিল্পকর্মের মতো মনে হয়।

গবেষকদের মতে, বইটির মাত্র ২০টি কপি অবশিষ্ট রয়েছে এবং ধারণা করা হয় এরমধ্যে ১৫টি আস্ত আছে। আশার কথা হলো, প্রায় এক দশক আগে নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরি একটি দুর্দান্ত উদ্যোগ নিয়েছে। তারা অ্যানার সেই ছবিগুলো তাদের অনলাইনে প্রকাশ করে। লাইব্রেরির সাইটে গিয়ে উপভোগ করা যাবে অতুলনীয় ছবিগুলো।

https://digitalcollections.nypl.org/collections/28d304b0-c612-012f-cd39-58d385a7bc34)   

এআইয়ের যুগেও আমরা দেখি নারী নিগৃহীত, নির্যাতিত, পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু অ্যানা এখন থেকে প্রায় দুইশ’ বছর আগে সামাজিক সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে ইতিহাসে জায়গা করে নিলেন।

যে সময়ে নারীদের শিক্ষা ও স্বাধীনতা সীমিত ছিল, সেই সময়ে আনা অ্যাটকিনস বিজ্ঞান ও শিল্পে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। তাই তিনি শুধু বিশ্বের প্রথম নারী আলোকচিত্রী নন—নারীর অগ্রযাত্রা, সাহস এবং সৃজনশীলতার এক অনন্য প্রতীক।

 

তথ্যসূত্র: সেন্ট অ্যান্ড্রুজ বিশ্ববিদ্যালয়, দ্য গার্ডিয়ান (২৩ জুন ২০১৭), পেটাপিক্সেল (১৮ এপ্রিল ২০১৩), ফটোগ্রাফি ডিকশনারি, সুদীপ্ত সালাম, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক (৭ জানুয়ারি ২০১৬), টেইলর অ্যান্ড ফ্রান্সিস অনলাইন ও ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম ওয়েবসাইট।