আইন আছে নজরদারি নেই, ১০ লাখের বেশি শিশু ঝুঁকিতে

শিশুশ্রম নির্মূলের জন্য বাংলাদেশে আইন আছে, জাতীয় কর্মপরিকল্পনা আছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও আছে। তারপরও দেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। এক দশকের বেশি সময় ধরে নানা প্রকল্প ও কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও কেন শিশুরা এখনও গ্যারেজ, ইটভাটা, পরিবহন খাত কিংবা গৃহকর্মে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে—সেই প্রশ্নই এখন সামনে চলে এসেছে। বিশেষ করে চার দেয়ালের আড়ালে গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুরা রয়ে গেছে সবচেয়ে কম দৃশ্যমান এবং সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা শ্রমিকদের কাতারে। শিশুশ্রমের সামগ্রিক হার নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন প্রকল্প নেওয়ার আগে কেন আগের উদ্যোগগুলো কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা এখন বেশি জরুরি।

কী বলছে সর্বশেষ জরিপ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) যৌথভাবে পরিচালিত ২০২২ সালের জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ অনুযায়ী, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৯৯ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার শিশু কোনও না কোনও ধরনের কাজে যুক্ত। শিশুশ্রমে নিয়োজিত শিশুর সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ ৭৬ হাজার এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রমে নিয়োজিত প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার।

অন্যদিকে, বিবিএস ও ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫’-এর প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শিশুশ্রমের হার বেড়ে ৯ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে; যা ২০১৯ সালে ছিল ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ফলে শিশুশ্রম পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সব কর্মজীবী শিশু কি শিশুশ্রমিক

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব কর্মজীবী শিশুকে শিশুশ্রমিক বলা যায় না। পরিবারের কাজে সীমিত সহায়তা বা এমন হালকা কাজ যা শিশুর শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে না, তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে শিশুশ্রম হিসেবে বিবেচিত হয় না। তবে দীর্ঘ সময় কাজ করা, বিদ্যালয়ে যেতে না পারা, শারীরিক বা মানসিক ঝুঁকিতে থাকা কিংবা বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করা শিশুশ্রমের আওতায় পড়ে।

কোথায় কাজ করছে শিশুরা?

বাংলাদেশে শিশুশ্রমের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে। কৃষিকাজ, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাত, নির্মাণশ্রম, ইটভাটা, গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপ, রিকশাভ্যান চালনা, ছিন্নমূল শ্রম এবং গৃহকর্মে বিপুলসংখ্যক শিশু কাজ করছে। এছাড়া শিল্প-কারখানা, পরিবহন ও জাহাজভাঙা শিল্পসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক খাতেও শিশুদের উপস্থিতি রয়েছে। অনানুষ্ঠানিক খাতে সরকারি তদারকি দুর্বল হওয়ায় শিশুশ্রম শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

কেন শিশুরা শ্রমবাজারে

শিশুশ্রমের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ দারিদ্র্য। পরিবারের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষায় অনেক পরিবার শিশুদের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, শিক্ষার ব্যয়, পারিবারিক সংকট এবং সামাজিক নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতাও শিশুদের কাজে ঠেলে দেয়।

অন্যদিকে কম মজুরিতে দীর্ঘ সময় কাজ করানো যায় বলে অনেক নিয়োগদাতা শিশুদের কাজে নিতে আগ্রহী। বিশেষ করে গৃহকর্মে শিশু নিয়োগকে সমাজের একটি অংশ এখনও স্বাভাবিক বা মানবিক সহায়তা হিসেবে দেখে। যদিও বাস্তবে এটি অনেক ক্ষেত্রে শোষণ ও নির্যাতনের রূপ নেয়।

আইনে কী আছে

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) অনুযায়ী, কর্মে নিয়োগের সর্বনিম্ন বয়স ১৪ বছর। তবে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের ‘হালকা কাজে’ নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হালকা কাজের স্পষ্ট সংজ্ঞা না থাকায় এর অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

সরকার ৪৩ ধরনের কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেছে। যেখানে ১৮ বছরের কম বয়সীদের নিয়োগ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে ওয়েল্ডিং, পরিবহন, ব্যাটারি কারখানা, তামাক শিল্প ও যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানাসহ বিভিন্ন খাতে শিশুদের কাজ করতে দেখা যায়।

সবচেয়ে অদৃশ্য খাত ‘গৃহশ্রম’

শিশুশ্রমের সবচেয়ে কম আলোচিত কিন্তু সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো গৃহকর্ম। এ খাতে কর্মরত শিশুদের বড় অংশই মেয়েশিশু। তারা রান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার ও শিশু পরিচর্যাসহ নানা কাজে নিয়োজিত থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা থাকে না। শিক্ষা, বিশ্রাম ও খেলাধুলার সুযোগও সীমিত। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তারা ঘরের ভেতরে কাজ করায় নির্যাতনের ঘটনা সহজে প্রকাশ্যে আসে না।

নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র

২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অ্যাকশন ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টের (এএসডি) ‘সিচুয়েশন অব চাইল্ড ডমেস্টিক ওয়ার্কার্স ইন ঢাকা সিটি’ শীর্ষক জরিপে ৩৫২ জন শিশু গৃহকর্মীর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

জরিপে দেখা যায়, প্রায় অর্ধেক শিশু কোনও না কোনও ধরনের নির্যাতনের শিকার। ৩১ দশমিক ৪৫ শতাংশ অতিরিক্ত কাজের চাপের মধ্যে থাকে, ১৮ দশমিক ৪৭ শতাংশ শারীরিক আঘাতের শিকার হয়, ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ মারধরের শিকার, ২০ দশমিক ৭৪ শতাংশ নিয়মিত মানসিক নির্যাতনের মুখে পড়ে এবং ১ দশমিক ৭ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে অপরাধ প্রমাণ করা কঠিন হওয়ায় অধিকাংশ ঘটনা আইনি প্রক্রিয়ায় পৌঁছায় না।

নতুন প্রকল্প নয়, আগে দরকার ব্যর্থতার মূল্যায়ন

শিশু অধিকারকর্মী ও ‘শিশুরাই সব’ সংগঠনের আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকার ৪৩টি খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম হিসেবে ঘোষণা করলেও বাস্তবে বিপুলসংখ্যক শিশু এখনও এসব কাজে নিয়োজিত। এটি আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতাকেই সামনে আনে।

তার মতে, এক দশকের বেশি সময় ধরে শিশুশ্রম নিরসনে বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। কিন্তু প্রত্যাশিত ফল আসেনি। তাই নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে আগের উদ্যোগগুলো কেন সফল হয়নি, তার স্বাধীন ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন জরুরি।

তিনি বলেন, শিশুশ্রম শুধু দারিদ্র্যের ফল নয়; শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়া, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, দুর্বল নজরদারি এবং আইনের সীমিত প্রয়োগও সমানভাবে দায়ী। বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে সরকারি তদারকি অত্যন্ত দুর্বল।

গৃহশ্রমকে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে লায়লা খন্দকার বলেন, এসব শিশু প্রায়ই শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। কিন্তু তাদের দুর্ভোগ অনেকাংশেই অদৃশ্য থেকে যায়।

একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশু নিয়োগের দায়ে কঠোর শাস্তি, প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল, হালকা কাজের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং কর্মে নিয়োগের সর্বনিম্ন বয়স ১৪ থেকে ১৬ বছরে উন্নীত করার প্রস্তাবও দেন তিনি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুশ্রম নির্মূলে আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়। কার্যকর শ্রম পরিদর্শন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, দরিদ্র পরিবারের জন্য সহায়তা, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের পুনরায় শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি– সবগুলো ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বাংলাদেশ গত এক দশকে কিছু অগ্রগতি অর্জন করলেও ১০ লাখের বেশি শিশু এখনও ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। এই বাস্তবতা বলছে, শিশুশ্রম নির্মূলের লড়াই এখনও অনেক দূরের পথ। কারণ কোনও শিশুর স্থান কর্মক্ষেত্রে নয়, তার স্থান বিদ্যালয়ে, পরিবারে এবং নিরাপদ শৈশবে।