মঙ্গলবার (জুন) সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার কাছাকাছি। আকাশ মেঘলা, বৃষ্টিও পড়ছে ঝির ঝির করে। রাজধানীর কাওরান বাজার রেলক্রসিং পার হতেই সামনে থেকে শুরু ট্রাক স্ট্যান্ড। সারি সারি কাভার্ড ভ্যান। রেলক্রসিং পার হয়েই ঠিক হাতের ডানে চোখে পড়ে এক শিশু ট্রাকের ইঞ্জিনের ভেতরে কোনও কিছু ঢোকানের চেষ্টা করছে।
কাছে গিয়ে শিশুটির নাম জিজ্ঞাসা করতে বলে ওঠে, সোলাইমান। এই বয়সে এমন কাজ করার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে সে জানায়, প্রাইমারির গন্ডি পার হয়নি, তার আগেই নেমে পড়েছে কাজের সন্ধানে। কখনও দিনের বেলায় কিছু সময় লেগুনায় থাকে, বাকি সময় ট্রাকের মেকানিকের কাজ শেখে।
সোলাইমানের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, তারা দুই ভাই, এক বোন। বাবা ট্রাকের ড্রাইভার, মা গৃহিণী। বরিশালের বাকেরগঞ্জ তাদের গ্রামের বাড়ি। বর্তমানে থাকে কাওরান বাজার রেলক্রসিং সংলগ্ন এক বাড়িতে। বাকেরগঞ্জে এক সময় প্রা্ইমারি স্কুলে গেলেও চতুর্থ শ্রেণির পর আর যাওয়া হয়নি। বাবার সঙ্গে ঢাকায় এসে এ কাজ করছে।
সোলাইমান বলে, লেগুনা থেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পাই। পরে এসে মেকানিক্যালের কাজ শিখি।
এক প্রশ্নের জবাবে সে জানায়, দুই বছরের মতো কাজ শিখতে পারলে তার ভালো আয় হবে, এটাই এখন তার নেশা। ভালো আয় করতে পারলে বাবা-মাকেও টাকা দিতে পারবে।
কথা শেষ হওয়ার মুহূর্তে সোলাইমান বলে ওঠে, আমরা তো খাবারের জন্য রাস্তায় আসছি। আমাগোরে খাওয়ার যেন কষ্ট না হয়, সে কারণে বাবা-মা পাঠাইছে।
রাজধানীর ইন্দিরা রোড। সারি সারি লেগুনা সাজানো। রাত ৯টার দিকে লেগুনার যাত্রী ডাকতে দেখা যায়, সবে শিশু থেকে উৎরানো একজনকে। নাম তার তারেক। এক প্রশ্নে সে জানায়, কখনও স্কুলেই যায়নি। তার বাবা বকুল হোসেন বর্তমানে সিএনজি অটোরিকশা চালক। ছোটবেলা তিনি লেগুনা স্ট্যান্ডে একজনের কাছে দিয়ে যান তারককে। সেই থেকে লেগুনার সঙ্গেই তার থাকা।
তারেকের বাড়ি পুরান ঢাকার কামরাঙ্গীচরে। ছোটবেলা থেকে অভাব অনটনের কারণে পরিবারের অবস্থা খারাপ ছিল। এখন তার এক ভাই অটো চালায়, বাবা সিএনজি চালান, সে কখনও লেগুনা চালায়, আবার কখনও হেলপারি করে। এ নিয়ে পরিবার এখন মোটামুটি স্বচ্ছল। দুই ভাই ও দুই বোনের সংসার তাদের।
তারেক বলে, আমরা কখনও স্কুলের স্বাদ পাইনি। এখন স্কুল-কলেজে যাওয়া দেখলে নিজের ইচ্ছে জাগে। কিন্তু এখন সময় পার হয়ে গেছে তাই আর আফসোস হয় না।
শুধু সোলাইমান বা তারেক নয়, রাজধানীজুড়েই লেগুনা কিংবা ট্রাকে কাজ শেখা শিশুর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। যে সময় তাদের স্কুলে যাওয়ার কথা, দূরন্তপনা করার কথা, সেই সময় তারা পরিবারের আয়-রোজগার বাড়ানোর কাজে ব্যস্ত।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, দেশে ৪৫ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ রয়েছে। এর মধ্যে ৪১ ধরনের কাজেই শিশুরা জড়িত।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানায়, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসণ প্রকল্পের চতুর্থ পর্যায়ে ১ লাখ শিশুকে ছয় মাসের উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ও চার মাসের প্রশিক্ষণ দিয়ে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাসে ১ হাজার টাকা করে উপবৃত্তিও দেওয়া হবে বিকাশের মাধ্যমে। এসডিজির লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সব ধরনের শিশুশ্রম নির্মূল এবং ২০৪১ সালের মধ্যে শিশুশ্রমমুক্ত উন্নত বাংলাদেশ গঠনে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি সংগঠন ‘শিশুরাই সব’ এর সম্প্রতি এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেশের শিশুশ্রম নিয়ে বলা হয়েছে, বিশ্বের কিছু অঞ্চলে শিশুশ্রম কমলেও বাংলাদেশে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫’ এর প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ৫-১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৯ দশমিক ২ শতাংশ শিশুশ্রমে নিয়োজিত; যা ২০১৯ সালের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়েছে। এর ফলে আরও প্রায় ১২ লাখ শিশু ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
বাংলাদেশে শিশুশ্রম মূলত দুই ধরনের খাতে বিদ্যমান; আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক। আনুষ্ঠানিক খাতের মধ্যে রয়েছে শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা, জাহাজভাঙা শিল্প ইত্যাদি। অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়েছে কৃষিকাজ, প্রাণীপালন, মৎস্যচাষ, মাছের ডিম বা পোনা সংগ্রহ, নির্মাণকাজ, ইটভাঙা, ইটভাটায় কাজ, গ্যারেজে কাজ রিকশাভ্যান চালনা, ছিন্নমূল শ্রম এবং গৃহকর্ম।
শিশুশ্রম শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিশুশ্রমে যুক্ত শিশুরা বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে, পরিবার ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, শারীরিক ও মানসিক বিকাশে পিছিয়ে যায় এবং সহিংসতা ও শোষণের ঝুঁকিতে থাকে। মনিটরিংয়ের অভাবে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শিশুদের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি।
শিশুশ্রম নিয়ে আইন
বাংলাদেশের জাতীয় শ্রম আইন-২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) অনুযায়ী কাজে নিয়োগের সর্বনিম্ন বয়স ১৪ বছর। তবে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুরা হালকা কাজে নিয়োজিত হতে পারে, যদি তা তাদের শিক্ষা ও বিকাশে বাধা সৃষ্টি না করে। কিন্তু হালকা কাজের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা আইনে নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই এই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে শিশুদের দীর্ঘসময় ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা হয়।
বাংলাদেশ সরকার শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর ৪৩ ধরনের কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং ১৮ বছরের নিচে কাউকে এসব কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। জাতিসংঘ শিশু অধিকার কমিটি বাংলাদেশে ঝালাই (ওয়েল্ডিং), সড়ক পরিবহন, যন্ত্রাংশ কারখানা, তামাক শিল্প ও ব্যাটারি কারখানায় শিশু নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সংস্থাটির আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, বাংলাদেশের শিশুশ্রম নিরসনে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার, এলডিসি গ্রাজুয়েশন ও এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে কর্মে নিয়োজিত হওয়ার সর্বনিম্ন বয়স ১৬ বছরে উন্নীত করা আবশ্যক। ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোরদের শুধু এমন কাজে নিয়োগের সুযোগ থাকা উচিত যা তাদের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়ক। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে শ্রম মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রনালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) এ ‘হালকা শ্রমের’ সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং আইন লঙ্ঘনের শাস্তি আরও কার্যকর করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকা হালনাগাদ করা প্রয়োজন। গৃহকর্মে শিশুদের নিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কেউ আইন ভঙ্গ করে শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ দিলে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা দরকার।