অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য করপোরেট খাতকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আহ্বান

সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং করপোরেট খাতের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণদের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। বক্তারা বলেন, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কার্যক্রমকে শুধু দানভিত্তিক উদ্যোগে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী শিশু ও যুবদের অধিকারভিত্তিক ও টেকসই উন্নয়নে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।

রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত “করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) অগ্রাধিকার ও প্রতিবন্ধীবান্ধব উন্নয়নের মধ্যে ব্যবধান দূরীকরণ: বিশেষ গুরুত্ব প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণদের প্রতি” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেন্টার ফর ডিজএ্যাবিলিটি ইন্ ডেভেলপমেন্ট (সিডিডি) বাংলাদেশ বিজনেস অ্যান্ড ডিজঅ্যাবিলিটি নেটওয়ার্কের (বিবিডিএন) সহযোগিতায়, লিলিয়ান ফন্ডস এবং ঢাকা ট্রিবিউন।

আলোচনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক সংগঠন, এনজিও, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে সিএসআর তহবিল বৃদ্ধি এবং কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা কামাল বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে সমন্বিত ও বহুমাত্রিক উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা এবং সরকার, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি করপোরেট খাতকে এ বিষয়ে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।

সিডিডির নির্বাহী পরিচালক নাজমুল বারী বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানো কোনও দয়ার বিষয় নয়; এটি অধিকার ও অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিক্ষা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও এখনও অনেক প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণ মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত। বর্তমানে সিএসআর কার্যক্রম আরও কাঠামোবদ্ধ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ও ইএসজি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিতে বিনিয়োগ এখনও সীমিত।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের টেকসই অর্থায়ন বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মুহাম্মদ মোদাব্বের হোসেন ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআর নীতিমালার আওতায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়তার সুযোগ রয়েছে। তিনি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, ব্যাংকিং সেবার প্রবেশগম্যতা বৃদ্ধি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

‘কমিউনিটি-বেইজড রিহ্যাবিলিটেশনের (সিবিআর) সব ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণদের অর্থবহ অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তি’ প্রকল্পের আওতায় কাম টু ওয়ার্ক (সিটিডব্লিউ), দিনাজপুরের ইমপ্যাক্ট গ্রুপের সদস্য মো. নাজমুজ সাকিব প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণদের জন্য সহায়ক প্রযুক্তি (অ্যাসিস্টিভ ডিভাইস), থেরাপি সেবা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানে সিএসআর সহায়তা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে মানবিকতা, মর্যাদা ও সমঅধিকারের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।

সিডিডির প্রোগ্রাম ম্যানেজার এস এম আলী হাসনাইন ফাতমে বলেন, একটি পরিবারে প্রতিবন্ধী শিশু থাকলে তাদের ব্যয় সাধারণ পরিবারের তুলনায় বেশি হয়। বিদ্যমান নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও প্রতিবন্ধী শিশু ও তরুণরা এখনও সামাজিক কুসংস্কার, প্রয়োজনীয় সেবার স্বল্পতা এবং উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়সহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

বিবিডিএনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুরতেজা রাফি খান করপোরেট খাত, এনজিও এবং সরকারের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব জোরদারের আহ্বান জানান। অন্যদিকে এ কে খান ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ট্রাস্টি সেক্রেটারি সালাহউদ্দিন কাসেম খান প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পুনর্বাসন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

যশোরের আশরাফ ফাউন্ডেশনের (এএফ) ইমপ্যাক্ট গ্রুপের সদস্য ওয়াকিমুল ইসলাম রিফাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সমঅধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবি জানান।

অনলাইনে যুক্ত হয়ে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক লিলিয়ান ফন্ডসের ইনস্টিটিউশনাল ফান্ডরেইজার জোহান ফ্রেডস্টেড বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিকে মানবসম্পদে বিনিয়োগ হিসাবে দেখতে হবে। সমন্বিত সিএসআর উদ্যোগ সমঅধিকার নিশ্চিতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।