দুই বছর বন্ধ থাকার পর ভারত বাংলাদেশিদের জন্য আবার ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করতেই ভিসাকেন্দ্রগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। সেবা চালুর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জমা পড়েছে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি আবেদন। অন্যদিকে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন, পাহাড়, হাওর, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসহ অসংখ্য পর্যটন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা এখনও আশানুরূপ নয়।
নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা, ভিসা জটিলতা, দুর্বল অবকাঠামো, উচ্চ ব্যয়ে নিম্নমানের সেবা, আন্তর্জাতিক প্রচারের অভাবসহ নানা কারণে বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশ এখনও আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠতে পারেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরাপত্তাহীনতার বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে
সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা নতুন করে সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে। নওগাঁর বদলগাছীর ঐতিহাসিক পাহাড়পুর পরিদর্শনে আসেন এক চীনা পর্যটক। সেখানে এক টিকটকার তার অনুমতি ছাড়াই ভিডিও ধারণ করে হয়রানি করেন। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ট্যুরিস্ট পুলিশ তৎপর হয়। গত ২২ জুন আব্দুল মাবুদ নামে ওই টিকটকারকে আটক করা হয়।
এরও আগে, গত ৮ মে নাটোরের গ্রিন ভ্যালি পার্কে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানের সময় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত দুই বিদেশি নাগরিককে কয়েকজন টিকটকার কটূক্তি করেন। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ৯ মে লালপুর থানায় মামলা হয়। পরে ১০ মে ভোরে আমিনুল ইসলাম ও রাসেল ইসলাম নামে দুজনকে আটক করে পুলিশ।
তবে শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়। হোটেলে থাকা ও খাবারের উচ্চমূল্য, নিম্নমানের সড়কব্যবস্থা, পর্যাপ্ত বিনোদনের অভাব এবং পর্যটনসেবার সীমাবদ্ধতাও বিদেশি পর্যটকদের নিরুৎসাহিত করছে। দীর্ঘদিন ধরে নানা পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বাস্তবায়নের অভাবে সম্ভাবনাময় এই খাত কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। ফলে এখনও দেশের পর্যটনশিল্পের প্রধান ভরসা দেশীয় পর্যটকেরাই।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ঘটনা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যা বিদেশিদের বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পর্যটনকেন্দ্রে তারা হয়রানি, চুরি-ছিনতাই, এমনকি মারধরেরও শিকার হন। এতে নিরাপত্তা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। যে দেশে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা থাকে, সেখানে বিদেশি পর্যটক যেতে চান না।
তাদের মতে, বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করতে প্রচারণা, ভিসা সহজীকরণসহ নানা বিষয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হলেও বাস্তবায়ন হয় না।
‘আলোচনা হয়, বাস্তবায়ন হয় না’
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সাবেক সভাপতি শিবলুল আযম কোরেশী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করার জন্য বছরের পর বছর আলোচনা হচ্ছে। প্রস্তাব দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। অথচ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্র ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন অনেক সমৃদ্ধ। বিদেশিরা এগুলো দেখতে চান, কিন্তু আমরা নিজেরাই নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করি।
তিনি বলেন, সরকারিভাবে পর্যটন খাতের উন্নয়নে অবহেলা রয়েছে। সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হলেও বছরের পর বছর তা বাস্তবায়ন হয় না।
শিবলুল আযম কোরেশীর মতে, বাংলাদেশ সম্পর্কে বিদেশে এখনও ক্ষুধা ও দারিদ্র্যপীড়িত দেশের নেতিবাচক ধারণা রয়ে গেছে। অথচ দেশ অনেক আগেই সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে। হলি আর্টিজান হামলার পর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয়। পরে অভিযুক্তরা গ্রেফতার হলেও সেই ইতিবাচক বার্তা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সমানভাবে প্রচার হয়নি। এরও প্রভাব পড়েছে বিদেশি পর্যটকের আগমনে।
তার মতে, ভিসা ব্যবস্থাও বড় বাধা। এখনও বাংলাদেশে ই-ভিসা চালু হয়নি। ভিসা পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। অন-অ্যারাইভাল ভিসার ক্ষেত্রেও যাত্রীদের বিমানবন্দরে তিন থেকে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। আবার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ চাইলে কাউকে প্রবেশের অনুমতি না দিয়ে ফেরতও পাঠাতে পারে। এসব বিষয় বিদেশি পর্যটকদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণের ক্ষেত্রেও বিদেশিদের সরকারি অনুমতি নিতে হয়। তিন পার্বত্য জেলায় যেতে তিন জেলার অনুমতি প্রয়োজন হয়। আবার সাজেকে যেতে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি—দুই জেলার অনুমতি লাগে। আবেদন করলেও কখন অনুমতি মিলবে, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই। এতে বিদেশিরা নিরুৎসাহিত হন।
তার ভাষ্য, বর্তমান সরকারের উচিত বিদ্যমান সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান করা, ব্যাপক প্রচার চালানো এবং বেসরকারি উদ্যোক্তাদের লাইসেন্স নবায়ন সহজ করা। এতে তারাও কার্যকরভাবে পর্যটনের প্রচারণায় যুক্ত হতে পারবেন।
নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের নজর
ট্যুরিস্ট পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার ফুয়াদ সাকিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তারা যেন কোনও ধরনের হয়রানি বা হেনস্তার শিকার না হন, সে বিষয়ে ট্যুরিস্ট পুলিশ সবসময় সজাগ।
তিনি বলেন, কোনও বিদেশি পর্যটক হয়রানির শিকার হলে বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বগুড়ায় এক বিদেশিকে হেনস্তার ঘটনায় অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে।
সম্ভাবনা আছে, কিন্তু অগ্রগতি নেই
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ বাংলাদেশ। এখানে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পাহাড়, পর্বত ও হাওর। এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যটনশিল্পের বিকাশ আশানুরূপ নয়। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অভাব, দুর্বল অবকাঠামো, প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণের পর্যটনবান্ধব মনোভাবের অভাব, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে বাংলাদেশ বিদেশি পর্যটক আকৃষ্ট করতে পারছে না। ফলে কম খরচে ভ্রমণের সুযোগ থাকলেও পর্যটকরা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন। এমনকি বাংলাদেশের পর্যটকরাও দেশের গন্তব্য এড়িয়ে বিদেশমুখী হচ্ছেন।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে দেশে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজার। ৩০ বছরে এই প্রবৃদ্ধি বৈশ্বিক পর্যটন বাজারের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল ও মালদ্বীপ পর্যটনকে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করলেও বাংলাদেশ এখনও জিডিপির মাত্র ৪ দশমিক ৪ শতাংশ এই খাত থেকে অর্জন করছে।
ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য বলছে, ১৯৯৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরে দেশে মোট প্রায় ৮৬ লাখ বিদেশি পর্যটক এসেছেন।
পর্যটন-সংশ্লিষ্টরা এ খাত পিছিয়ে থাকার পেছনে সাতটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন—অবকাঠামোগত দুর্বলতা, আকাশপথের সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক প্রচারের অভাব, নিরাপত্তা নিয়ে আস্থার সংকট, উচ্চ ব্যয়ে নিম্নমানের সেবা, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং তথ্য ও দক্ষ জনবলের অভাব।
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুর উফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সমস্যা ও সমাধানের পথ দুটোই আমাদের জানা। কীভাবে এসব বাধা অতিক্রম করা যায়, সে বিষয়েই আমরা কাজ করছি। একই সঙ্গে পর্যটনের প্রচার-প্রচারণাও বাড়ানো হচ্ছে। আশা করছি, সম্ভাবনাময় এ খাত আগামী দিনে আরও উজ্জ্বল হবে।’