শনিবার (১১ জুলাই) বেলা সাড়ে ১১টা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহির্গমনমুখে গাড়ির দীর্ঘ সারি। আন্তর্জাতিক টার্মিনালের সামনে থেকে মূল সড়ক পর্যন্ত যানজট। উন্নয়নকাজের কারণে এলোমেলো পরিবেশের সঙ্গে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং মিলিয়ে দেশের প্রধান বিমানবন্দরে যাত্রীদের প্রতিদিনই পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে বিদেশিদের কাছেও বাংলাদেশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শুধু বিমানবন্দর এলাকার সড়ক নয়, আগমনী ক্যানোপির ভেতর ও বাইরেও শত শত গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। বিমানবন্দরের গোলচত্বর থেকে ভেতরের দিকে যত এগোনো যায়, ততই গাড়ির সারি দীর্ঘ হয়েছে। কোনও গাড়ি আগমনী, কোনওটি বহির্গমনমুখী। দুই পাশেই দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করছে অসংখ্য গাড়ি। পার্কিংয়ের জায়গাও প্রায় পূর্ণ।
শনিবার সকালে আগমনী টার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২ এর প্রবেশ ও বহির্গমনমুখে গাড়ির তীব্র চাপ গেছে। আবার আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় এলোমেলোভাবে রাখা হয়েছে গাড়ি। পরিস্থিতি এমন যে পথচারীদের চলাচলও করাও কঠিন। গাড়ির শৃঙ্খলা ফেরাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তেমন কোনও তৎপরতা চোখে পড়েনি। তারা নিজ নিজ অবস্থানে থাকলেও যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি। উল্টো এ প্রতিবেদক যানজটের ছবি তুললে এক সদস্য এসে জানতে চান, তাদের ছবি তোলা হয়েছে কি না।
দুর্ঘটনা ও যানজট কমাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-সংযুক্ত আন্ডারপাস নির্মাণের কাজ চলছে। বিমানবন্দর থেকে আশকোনা হজ ক্যাম্প পর্যন্ত ১ হাজার ৭০ মিটার দীর্ঘ আন্ডারপাসটি ১ হাজার ১৮৩ দশমিক ৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে আর্মি সদরদপ্তরের ২৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড।
আন্ডারপাসে এস্কেলেটর, এলিভেটর, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক আলো ও বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, মালামাল পরিবহনের জন্য বগি চলাচলের সুবিধা থাকবে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়ও যেন প্রাকৃতিক অক্সিজেন প্রবাহ বজায় থাকে, সে জন্য ভেন্টিলেশন সিস্টেম থাকবে। এতে আটটি প্রবেশ ও বহির্গমন পথ, আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং প্রায় ১ দশমিক ১৫ লাখ লিটার পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থাও থাকবে।
উন্নয়নকাজের কারণে কয়েক বছর ধরে বিমানবন্দরের ল্যান্ডসাইডের বিভিন্ন অংশ টিন দিয়ে ঘেরা। এতে সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি দিকনির্দেশনার চিহ্নও স্পষ্টভাবে দেখা যায় না। ফলে প্রথমবার বিমানবন্দরে আসা যাত্রী ও তাদের স্বজনদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
আজিজুর রহমান নামে এক যাত্রী বলছিলেন, ‘একটা দেশে যখন কোনো অতিথি আসেন, সেটা ঘুরতেই হোক কিংবা ব্যবসায়িক কাজে। প্রথমে তো তিনি বিমানবন্দরেই আসেন। সেখানে যদি কোনোরকম ভোগান্তির পরিস্থিতি থাকে, তাতে ইম্প্রেশনটা ভালো পড়ে না। সরকারের এই বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিৎ।’
ওবায়দুর রহমান আরেকজন বলেন, ‘আগমনী টার্মিনাল-২ থেকে বের হওয়ারই উপায় নেই। একদিকে কয়েকটি গাড়ি, অন্যদিকে টার্মিনালের ভেতরে শত শত মানুষ। টার্মিনালের ভেতরে যেভাবে মানুষ ও গাড়ি প্রবেশ করছে এবং দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করছে, তাতে বের হতেই নাজেহাল হতে হচ্ছে। বের হয়েও নাজেহাল, আর সামনে দেখেন কত বড় জ্যাম। এগুলো কি বিমানবন্দরের পরিবেশ হতে পারে? বিদেশ থেকে কেউ দেশে এলে তাদের কেমন অভিজ্ঞতা হবে বুঝতে পারছেন?’
তিনি আরও বলেন, ‘বিমানবন্দরের পরিবেশ ঠিক করতে হবে। এর জন্য কর্তৃপক্ষকে যা যা করার তাই করতে হবে।’
আসলাম রহমান নামের আরেক যাত্রী বলেন, ‘দুই-তিন বছর আগে, যখন উন্নয়ন কাজ শুরু হয়নি তখনও পরিস্থিতি এতটা খারাপ ছিল না। অনেক ফুলের গাছ ছিল, সবসময় ফুল ফুটে থাকতো, দেখতেও সুন্দর লাগতো। এখন সেই সাজালো-গোছালো পরিবেশ তো নাই-ই, উল্টো যানবাহনের যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তাতে ভোগান্তি বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘গাড়ির সারি তো দেখছেন, মাঝে মাঝে হকারও ঢুকে পড়ে। আর ভিক্ষুক তো ক্যানোপি পর্যন্ত চলে আসতো। ভিক্ষুকের বিরুদ্ধে অভিযান চলার কারণে তাদের উৎপাত কমেছে। কিন্তু একজন প্রবাসী মালামাল নেওয়ার পর মূল সড়কে যেতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। এখানে স্বাচ্ছন্দ্য বলতে কিছু নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘যত্রতত্র লোকজন টার্মিনালের ভেতরে ঢুকে পড়ার কারণে চোরদের ভয়ও আছে। মালামাল ঠিকভাবে না আগলে রাখলে যে কোনও মুহূর্তে চুরি হয়ে যেতে পারে।’
বিমানবন্দরে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত খায়রুল আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিমানবন্দরের বাইরের অবস্থা এককথায় ভয়াবহ। বিমানবন্দরে ঢোকা থেকে বের হওয়া পর্যন্ত পদে পদে ভোগান্তি। শুধু গাড়ি নিয়ে ঢোকা ও বের হওয়াই এক ধরনের যন্ত্রণা।’
তিনি বলেন, ‘আপনি যদি বহির্গামী যাত্রী নিয়ে আসেন, তাকে নামিয়ে দেওয়ার পরও সহজে বিমানবন্দর থেকে বের হতে পারবেন না। আর আগত যাত্রীকে নিয়ে বের হতে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘সবাইকে তৎপর হতে হবে। দেশের প্রধান বিমানবন্দরে এমন পরিস্থিতি থাকলে বাইরে খারাপ বার্তা যাবে। সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা উচিত।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সবসময় এমনটা হয় না। যখন যাত্রীর চাপ থাকে, তখন এ রকম পরিস্থিতি হয়।’ বিমানবন্দরে আসা গাড়ির শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে ল্যান্ডসাইডে দায়িত্বরতদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
উন্নয়ন কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভালো কিছু পেতে হলে একটু তো কষ্ট মেনে নিতেই হবে। আমরা প্রত্যাশা করছি, আন্ডারপাসটি চালু হলে এই সমস্যা অনেকটাই দূর হয়ে যাবে।’