আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা মান আরও শক্তিশালী করতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অডিটকে সামনে রেখে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ট্রান্সপোর্ট এবং আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার নির্ধারিত অডিটকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে সার্বিক প্রস্তুতির প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
রবিবার (১২ জুলাই) বেবিচকের জনসংযোগ বিভাগের সহকারী পরিচালক কাওছার মাহমুদ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বেবিচক সূত্র জানায়, যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ট্রান্সপোর্ট আগামী ১৪ থেকে ১৭ জুলাই বাংলাদেশে নিরাপত্তা অডিট পরিচালনা করবে। এ অডিটে মূলত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে যুক্তরাজ্যগামী যাত্রী এবং কার্গোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যালোচনা করা হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী যাত্রী ও ডাক বা কার্গো নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করাই হবে এ অডিটের মূল উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে, চলতি বছরের ২৬ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে আইকাও ইউএসপি-সিএমএ (ইউনিভার্সাল সিকিউরিটি অডিট প্রোগ্রাম-কন্টিনিউয়াস মনিটরিং অ্যাপ্রোচ) অডিট করবে। এ সময় বেবিচক সদরদফতর, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন কার্যক্রম পর্যালোচনা করবেন আইকাওর বিশেষজ্ঞরা।
কাওছার মাহমুদ জানান, আন্তর্জাতিক এই দুটি অডিটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তুতি কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী নিয়মিতভাবে প্রস্তুতির অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করছেন। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় পরপর মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে প্রস্তুতির অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, গত বছরের নভেম্বর থেকেই আইকাও অডিটের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। নিরাপত্তার ৯টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ তদারকির জন্য তিনটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটি নিয়মিত পর্যালোচনা, গ্যাপ অ্যানালাইসিস এবং প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদান করছে, যাতে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ঘাটতিগুলো দ্রুত পূরণ করা যায়।
প্রস্তুতি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রতি মাসে বেবিচকের সদস্যের (সিকিউরিটি) নেতৃত্বে অগ্রগতি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি দুই মাস অন্তর বেবিচক চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে প্রস্তুতির অগ্রগতি মূল্যায়ন, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে সার্বিক প্রস্তুতির প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে অবশিষ্ট কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করতে অত্যাধুনিক এক্স-রে মেশিন, উন্নত স্ক্যানারসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সরঞ্জামের ফ্যাক্টরি অ্যাককসেপটেন্স (এফএটি) ইতিমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এসব সরঞ্জাম আগামী আগস্ট মাসে দেশে পৌঁছাবে এবং ১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক অডিটের আগে নিজেদের প্রস্তুতি আরও নিখুঁতভাবে যাচাই করতে আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে বেবিচক নিজস্ব উদ্যোগে একটি প্রি-অডিট পরিচালনা করবে। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে আইকাও নিরাপত্তা অডিটে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৬৮.৫৫ শতাংশ, যেখানে আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ছিল ৬৫ শতাংশ। এবারের লক্ষ্য ৭৫ শতাংশের বেশি স্কোর অর্জন করা। অন্যদিকে, সর্বশেষ ডিএফটি অডিটে বাংলাদেশ কার্গো নিরাপত্তায় ১০০ শতাংশ এবং যাত্রী নিরাপত্তায় প্রায় ৯৩ থেকে ৯৪ শতাংশ স্কোর অর্জন করেছিল।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চলমান প্রস্তুতি, আধুনিক নিরাপত্তা সরঞ্জাম সংযোজন এবং নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের তদারকির ফলে আসন্ন ডিএফটি ও আইকাও অডিটে বাংলাদেশ আরও ভালো ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হবে। এর মাধ্যমে দেশের বিমানবন্দরগুলোর আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বৈশ্বিক বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে বলে আশা করা হচ্ছে।