বিল পাস ও স্থায়ী কমিটি গঠনে সরকারের ভূমিকা নিয়ে টিআইবির উদ্বেগ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিল পাস ও সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার একচ্ছত্র ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির দাবি, কার্যপ্রণালী বিধি উপেক্ষা করে বিল উত্থাপন ও আলোচনা ছাড়াই তা পাস এবং স্থায়ী কমিটি গঠনে প্রচলিত চর্চার ব্যত্যয় ঘটিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছে।

একইসঙ্গে সংসদীয় কমিটিগুলোর ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে নতুন আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কার্যপ্রণালী বিধির ৭৭ অনুযায়ী কোনও বিল উত্থাপনের পর তা স্থায়ী কমিটি, বাছাই কমিটি বা জনমত যাচাইয়ের জন্য পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। তবে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী অধিকাংশ বিলই স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কিন্তু ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’-এর ক্ষেত্রে এসবের কোনোটিই অনুসরণ করা হয়নি।

তিনি বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জনমত যাচাই বা বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাবও আমলে নেওয়া হয়নি। সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি। সংসদ সদস্যদের কাছে বিলের অনুলিপি অন্তত তিন দিন আগে সরবরাহ করার প্রচলন থাকলেও এ বিলের অনুলিপি উত্থাপনের ঠিক আগে দেওয়া হয়। ফলে বিলটি যাচাইয়ের বাস্তবসম্মত সুযোগ না দিয়েই কার্যপ্রণালী বিধি লঙ্ঘনের মাধ্যমে আইনটি পাস করা হয়েছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল, ২০২৬ এবং পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) বিল, ২০২৬ কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই সম্পূরক কার্যসূচির মাধ্যমে সংসদে উত্থাপন করা হয়। এছাড়া বিরোধী দলের মতামত ও আপত্তি উপেক্ষা করে আরও কয়েকটি বিল দ্রুত সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে পাস করা হয়েছে। তার ভাষায়, এ ধরনের একতরফা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া সাংবিধানিক ও সংসদীয় বিধি লঙ্ঘনের প্রশ্ন তৈরি করেছে এবং কর্তৃত্ববাদী আমলের সংসদের সঙ্গে বর্তমান সংসদের পার্থক্য কোথায়—সে প্রশ্নও সামনে এনেছে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন প্রসঙ্গে কার্যপ্রণালী বিধির ১৮৮ উল্লেখ করে তিনি বলেন, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীকে অর্থ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়েছে, যা স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন তৈরি করেছে। তার মতে, মন্ত্রিসভার একজন সদস্য অন্য মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে তদারকি করতে পারবেন, তা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন রয়েছে। এতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, নব্বই-পরবর্তী কোনও সংসদে এ ধরনের চর্চা দেখা যায়নি। স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা বিতর্কিত ব্যক্তিদের কমিটির সদস্য বা সভাপতি করা হলে সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এসব কমিটির সক্ষমতা ও কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের ২৪ নম্বর ধারায় ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট একমত হয়েছিল যে, সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত চারটি সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদও সংসদে আসনসংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে বণ্টনের অঙ্গীকার ছিল। সে হিসাবে প্রায় ২৬ শতাংশ কমিটির সভাপতি বিরোধী দলের হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

তিনি বলেন, এতে শুধু জুলাই সনদের অঙ্গীকারই নয়, ক্ষমতাসীন দলের ৩১ দফা ও নির্বাচনি ইশতেহারও অর্থহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

বিতর্কিত কমিটিগুলো পুনর্গঠন এবং ভবিষ্যতে সব কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে ঘোষিত অঙ্গীকার অনুসরণের আহ্বান জানিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সংবিধানের ৭৮(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদীয় কমিটির ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বাড়াতে সব অংশীজনকে সম্পৃক্ত করে নতুন আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি। পাশাপাশি জুলাই সনদে উল্লেখিত চারটি সংসদীয় কমিটিসহ সরাসরি নির্বাচিত সব নারী সংসদ সদস্যকে অন্তত একটি করে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করারও আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।