‘যোগ্যতার অভাবে নয়, কাঠামোগত বাধায় কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্বে পিছিয়ে নারীরা’

বাংলাদেশে নারীদের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তারা নেতৃত্বের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। তবে যোগ্যতার অভাবে নয়, বরং কাঠামোগত ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে এখনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি আশানুরূপ নয় বলে মন্তব্য করেছেন নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী ও উন্নয়নকর্মীরা।

বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘রাইজ অ্যান্ড লিড: ব্রেকিং ব্যারিয়ারস, শেয়ারিং পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাডভান্সিং উইমেনস লিডারশিপ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলা হয়। ‘নারীরা নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত, কিন্তু কর্মক্ষেত্র কি ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে প্রস্তুত?’—এই প্রতিপাদ্যে আয়োজিত আলোচনায় অংশ নেন নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী নেতা ও উন্নয়ন খাতের প্রতিনিধিরা।

অক্সফাম ইন বাংলাদেশ ও ঢাকা ট্রিবিউনের যৌথ উদ্যোগে ‘অনির্বাণ–রাইজ অ্যান্ড লিড’ কর্মসূচির আওতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, অসম সুযোগ, বৈষম্যমূলক কর্মসংস্কৃতি, অনমনীয় কর্মব্যবস্থা এবং অবৈতনিক পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজের অসম বোঝা নারীদের নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছাতে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে নারী ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুল বলেন, ‘শুধু আইন পরিবর্তন করলেই হবে না, সমাজে নেতৃত্ব ও সমতার ধারণারও পরিবর্তন প্রয়োজন।’

তিনি বলেন, ‘নেতৃত্ব কোনও পদ বা উপাধি নয়, এটি একটি মানসিকতা। সমাজে নেতৃত্ব ও সমতা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে শুধু আইন ও প্রতিষ্ঠান দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।’

তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছোটবেলা থেকেই নেতৃত্বের গুণাবলি, আত্মসচেতনতা ও মানসিক সুস্থতা বিকাশে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি নারীর নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করা সংগঠনগুলোর সঙ্গে সরকার একযোগে কাজ করবে বলেও জানান।

অনুষ্ঠানে ‘উইমেন আর রেডি টু লিড: আর আওয়ার ওয়ার্কপ্লেসেস রেডি টু শেয়ার পাওয়ার?’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন অক্সফাম ইন বাংলাদেশের প্রোগ্রাম পরিচালক মাহমুদা সুলতানা এবং চেঞ্জ মন্ত্রাসের লিডারশিপ ল্যাবের ফ্যাসিলিটেটর উমা চ্যাটার্জি।

মাহমুদা সুলতানা বলেন, ‘অনেক যোগ্য নারী নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন না দক্ষতার অভাবে নয়, বরং অসম সুযোগ, সীমিত আত্মবিশ্বাস এবং তাদের বিকাশে সহায়ক নয়—এমন কর্মপরিবেশের কারণে।’

গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নারীদের জন্য সমান নেতৃত্বের সুযোগ নিশ্চিত করতে পারেনি।

অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের আইএলও-ভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, দেশে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ।

গবেষণায় আরও বলা হয়, কর্মরত নারীদের ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যেখানে চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা ও পদোন্নতির সুযোগ সীমিত। পাশাপাশি পুরুষদের তুলনায় নারীরা সাত গুণেরও বেশি অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যার কাজ করেন। ফলে নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও তাদের কমে যায়।

গবেষণায় নারীদের নেতৃত্বে পৌঁছানোর পথে বৈষম্যমূলক কর্মপরিবেশ, অনমনীয় কর্মব্যবস্থা, অনিরাপদ কর্মস্থল, মেন্টর ও পেশাগত নেটওয়ার্কে সীমিত প্রবেশাধিকার, ক্যারিয়ারে বিরতির কারণে সামাজিক নেতিবাচক ধারণা, ক্ষমতার অসম বণ্টন এবং দীর্ঘদিনের বৈষম্য থেকে তৈরি আত্মবিশ্বাসের সংকটকে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আলোচনার শুরুতে ঢাকা ট্রিবিউনের নিউজ এডিটর আনন্দ মোস্তফা বলেন, ‘নারীরা প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু যোগ্যতার অভাবে নয়, বরং কাঠামোগত ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তারা এখনও নেতৃত্বের পর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছেন না।’

তিনি বলেন, ‘নারীর নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কের সময় পেরিয়ে গেছে। এখন প্রয়োজন এমন কর্মক্ষেত্র, যেখানে সুযোগ নির্ধারিত হবে যোগ্যতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে, লিঙ্গের ভিত্তিতে নয়।’

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অক্সফাম ইন বাংলাদেশের ইনফ্লুয়েন্সিং, কমিউনিকেশনস, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের প্রধান মো. শরিফুল ইসলাম। এতে চেঞ্জ মন্ত্রাসের ফ্যাসিলিটেটর রূপ সেনও অংশ নেন।

আয়োজকরা জানান, ‘রাইজ অ্যান্ড লিড’ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো নারীর নেতৃত্ব, ক্যারিয়ারে পুনঃপ্রবেশ এবং কর্মক্ষেত্রে পদোন্নয়নকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে নিয়োগকর্তা, নীতিনির্ধারক ও উন্নয়ন সহযোগীদের আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে উৎসাহিত করা।