যাত্রাবাড়ীর গণশুনানিতে স্বজনহারাদের কান্না, উঠলো বিচার ও স্মৃতিস্তম্ভের দাবি

চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় সংঘটিত সহিংসতায় ব্যাপক প্রাণহানি ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। প্রসিকিউশনের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, এসব ঘটনায় অন্তত ৮৫ জন শহীদ হন এবং শত শত মানুষ নিহত ও আহত হন।

রবিবার (২ আগস্ট) নিহত ও আহতদের স্বজনরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর দলের সামনে হাজির হয়ে তাদের প্রিয়জন হারানোর হৃদয়বিদারক স্মৃতি তুলে ধরেন। কান্নাভেজা কণ্ঠে তারা সেই বিভীষিকাময় দিনের বর্ণনা দেন। একই সঙ্গে বিচার, জবাবদিহি, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং যাত্রাবাড়ীতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর নবী টাওয়ারে আয়োজিত গণশুনানিতে অর্ধশতাধিক শহীদ পরিবারের নারী-পুরুষ অংশ নেন। তাদের অনেকেই গলায় শহীদ স্বজনের ছবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে এসেছিলেন। এ সময় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম শহীদ পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তার সঙ্গে স্থানীয় বিএনপি নেতা নবীউল্লাহ নবী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর এবং তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

স্বজন হারানোর স্মৃতি তুলে ধরে আহাজারি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে গুলিতে নিহত হন শিক্ষার্থী মিরাজ হোসেন। প্রতিপক্ষের ছোড়া বৃষ্টির মতো গুলি তার বাম পাঁজর ভেদ করে বেরিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে আহত হওয়ার পর হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।

মিরাজের বাবা মো. আব্দুর রব কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘দেশকে ভালোবেসে আন্দোলন করতে গেছিলো মিরাজ। সবাই ফিরে এসেছে, কিন্তু মিরাজ আর ফিরে আসেনি।’ ছেলে হত্যার বিচার দাবি করে তিনি বলেন, ‘দোষীদের ফাঁসি হোক—এটাই আমার চাওয়া। আমি ন্যায়বিচার চাই।’

২০২৪ সালের ২০ জুলাই আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগের খাম্বার গোড়ায় গুলিতে নিহত হন আব্দুর রহমান জিসান (২০)। পানির ব্যবসা করতেন তিনি। জিসানের বাবা, প্রবাসী বাবুল সরদার জানান, ছেলে হত্যার বিচার চেয়ে ওই বছরের ৩০ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলা করা হয়। যাত্রাবাড়ী থানা মামলাটি তদন্ত করছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম ন্যায়বিচার এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে রায়েরবাগ এলাকায় পুলিশের গুলিতে মারা যান মো. সোহেল রানা (৩৯)। তাঁর মা রাশেদা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলের লাশ পাই নাই। কোনো মামলাও করি নাই।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মামলা করে কী হবে, ছেলে তো পাবো না। দুই বছর হয়ে গেল, আমার বুক খালি। হত্যার বিচার হয় নাই। কোথায় বিচার হচ্ছে তাও জানি না।’

রাশেদা বেগম, আব্দুর রব ও বাবুল সরদারের মতো আরও অসংখ্য স্বজনের কান্না ও আহাজারিতে যাত্রাবাড়ীর নবী টাওয়ারের দ্বিতীয় তলার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। সেদিন কীভাবে তাদের সন্তানদের পাখির মতো গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, সেই নির্মম স্মৃতি একে একে তুলে ধরেন তারা।

কেউ সন্তান, কেউ বাবা, আবার কেউ ভাই হত্যার বিচার চেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। তাদের ভাষ্য, দুই বছর ধরে প্রিয়জন হারিয়ে তারা নির্বাক ও অসহায়। নানা আশ্বাস পেলেও দৃশ্যমান কোনো আর্থিক সহযোগিতা পাননি। একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি হতাহতের এলাকা যাত্রাবাড়ীতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবিও জানান তাঁরা।

চিফ প্রসিকিউটরের আশ্বাস

শহীদ পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য শোনার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম ন্যায়বিচার এবং ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন।

তিনি বলেন, যাত্রাবাড়ীতে সংঘটিত জুলাই আন্দোলন চলাকালে হত্যার বিচার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুততার সঙ্গে করা হবে। সঠিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত বিচারের মাধ্যমে জুলাই শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে চান তারা। এজন্য তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সবাইকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।

আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি শহীদ হয়েছেন এই যাত্রাবাড়ীতে। আমরা ইতিমধ্যে প্রাথমিকভাবে ৮৫ জনের তালিকা পেয়েছি। ২০২৪ সালের ৫ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে ৫০ থেকে ৫৫ জনকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনার পর কেউ থানায় বা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, যাত্রাবাড়ীতে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হবে। এ-সংক্রান্ত একাধিক মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন। এই এলাকার সব হত্যা মামলা একত্র করে একটি চার্জশিট দাখিলের মাধ্যমে বিচার করার চেষ্টা চলছে। অন্যথায় পৃথকভাবে বিচার করতে গেলে দীর্ঘ সময় লাগবে।

এ সময় ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতা নবীউল্লাহ নবী বলেন, জুলাই গণআন্দোলনে শহীদদের আত্মত্যাগ না হলে স্বৈরাচারের পতন ঘটানো সম্ভব হতো না। তিনি বলেন, ‘আমরা শহীদ পরিবারকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। সেজন্য সরকারসহ সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’