রাষ্ট্র সংস্কারের সুযোগ কি হাতছাড়া হলো

চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। মানুষ শুধু সরকারের পরিবর্তন চায়নি। চেয়েছিল রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাতে। পুলিশ হবে পেশাদার। প্রশাসন হবে দলনিরপেক্ষ। বিচার বিভাগ থাকবে স্বাধীন। নির্বাচন কমিশন থাকবে সরকারের প্রভাবের বাইরে। দুর্নীতি দমন কমিশন ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবে। বিশ্ববিদ্যালয় মুক্ত হবে দলীয় দখল থেকে।

অভ্যুত্থানের দুই বছর পর অনেকেরই প্রশ্ন— অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছর এবং নির্বাচিত সরকারের ছয় মাসে দেশের মানুষের সেই আকাশচুম্বী প্রত্যাশার কতটুকু পূরণ হয়েছে?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দুই বছরে রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কমিশন গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন এসেছে। অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি হয়েছে। কয়েকটি অধ্যাদেশও জারি হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতার কাঠামো, নিয়োগব্যবস্থা ও জবাবদিহিতে কতটা পরিবর্তন এসেছে— তার জবাব এখনও স্পষ্ট নয়।

সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশন নিয়ে প্রথম দফায় ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। পরে স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, শ্রম ও নারীবিষয়ক আরও পাঁচটি কমিশন কাজ করে।

মোট ১১টি কমিশন রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাত নিয়ে শত শত সুপারিশ দিয়েছে। বাস্তবায়িত হয়েছে খুবই অল্প। কিছু সুপারিশ আংশিকভাবে কার্যকর হয়েছে। বড় অংশই এখনও কাগজে সীমাবদ্ধ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে জনপ্রশাসনের সংস্কার নিয়ে।

প্রশাসনে ঐতিহাসিক সুযোগ হাতছাড়া

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের মূল্যায়ন কঠোর। তার মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। সেই লক্ষ্য সামনে রেখে প্রশাসনিক সংস্কারের যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তার প্রায় পুরোটাই হাতছাড়া হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউনকে ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘‘জুলাই অভ‍্যুত্থানের অন্যতম অভীষ্ট রাষ্ট্রসংস্কারের অংশ হিসেবে প্রশাসনিক সংস্কারের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, তার প্রায় পুরোটাই হাতছাড়া হয়েছে। কারণ কোন সংস্কার করা যাবে, কোনটা করা যাবেনা, তা নির্ধারণ করেছে আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী অংশ। প্রশাসনিক সংস্কারের নামে যতটুকু হয়েছে তা ছিল মূলত লোকদেখানো, এমনকি তড়িঘড়ি করে পাস করা অধ‍্যাদেশের বিতর্কিত ধারা অপব্যবহার করে সরকার-পরিচালন কাঠামোতে দীর্ঘকালের লালিত আন্তক‍্যাডার বৈষম্য নিরসনের দাবি নিয়ন্ত্রণ করে তার আরও গভীরতর প্রাতিষ্ঠানিকরন হয়েছে। ক্ষমতার হাতবদলের প্রক্রিয়ায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা, এমনকি সচিবালয়ে মবসহ অভূতপূর্ব অরাজকতা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে অন‍্যসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারি খাতের মতো সরকারি চাকরিতে সার্বিকভাবে দলীয়করণের প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে। যার ফলে সরকার ও সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ‘এবার আমাদের পালা’ — এই প্রবণতা উদ্বেগজনক ভাবে বাড়ছে।’’

ইফতেখারুজ্জামানের এই বক্তব্য প্রশাসন সংস্কারের মূল সংকটটিই সামনে আনে। গত দুই বছরে পদোন্নতি হয়েছে। পদায়ন বদলেছে। দীর্ঘদিন বঞ্চিত হিসেবে পরিচিত অনেক কর্মকর্তা সুযোগ পেয়েছেন। অনেককে অবসরে পাঠানো হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পদোন্নতি ও পদায়নের প্রকাশ্য মানদণ্ড তৈরি হয়নি। স্বাধীন সিভিল সার্ভিস ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য নীতিও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

ফলে ব্যক্তি বদলেছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন মুখ এসেছে। কিন্তু আনুগত্যভিত্তিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি কতটা বদলেছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

কাঠামো নয়, নেতৃত্বের হাতবদল

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদের মূল্যায়নও প্রায় একই। তার মতে, সরকার এখনও বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই কাজ করছে। বৈষম্য দূর করতে হলে শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। আইন, প্রতিষ্ঠান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় মৌলিক পরিবর্তন দরকার।

তিনি বলেন, “৫ আগস্টের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে যা হয়েছে, তার বড় অংশই নেতৃত্ব ও ক্ষমতার হাতবদল। কাঠামোগত সংস্কার বলতে জবাবদিহি, বৈষম্যহীনতা, সর্বজনীন অধিকার এবং কার্যকর প্রতিকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা বোঝায়। পুরোনো কাঠামোর মধ্যে শুধু নতুন মানুষ বসিয়ে প্রকৃত সংস্কার করা যায় না।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘শ্রম খাতেও একই চিত্র। কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আলোচনা হয়েছে। কমিশন সুপারিশ দিয়েছে। কিন্তু জাতীয় ন্যূনতম মজুরি, সব শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা এবং সর্বজনীন আইনি সুরক্ষার মতো মৌলিক বিষয় এখনও নিশ্চিত হয়নি। এ খাতে সংস্কার করতে হলে বিদ্যমান ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে ভাবতে হবে। শুধু মজুরি বোর্ড বা বিচ্ছিন্ন কিছু সিদ্ধান্ত দিয়ে শ্রমিকের দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়।”

পুলিশে বড় পরিবর্তন এখনও হয়নি

পুলিশ সংস্কার কমিশন স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের সুপারিশ করেছিল। গ্রেফতার ও হেফাজতে মানবাধিকার সুরক্ষার কথা বলেছিল। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, পদোন্নতিতে পেশাদারত্ব এবং বেআইনি নির্দেশ প্রত্যাখ্যানকারী কর্মকর্তার সুরক্ষার প্রস্তাবও ছিল। কিন্তু পোশাক পরিবর্তন ছাড়া মাঠপর্যায়ে বড় কোনও কাঠামোগত পরিবর্তন এখনও দৃশ্যমান নয়।

পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, “পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বড় ধরনের পরিবর্তন এখনও হয়নি। কিছু সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে। তবে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের যে প্রস্তাব ছিল, সেটি এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। কমিশনের প্রতিবেদনে থাকা কয়েকটি বিষয় অবশ্য আগে থেকেই পুলিশের কার্যক্রমে ছিল।”

স্বাধীন পুলিশ কমিশন ছাড়া পুলিশের জবাবদিহি ও পেশাদারত্ব কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এটি একটি বড় বিতর্কের বিষয়। এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাই না।”

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে অবশ্য পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তার মূল্যায়ন তুলনামূলক ইতিবাচক। খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, “আগের মতো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এখন নেই। স্থানীয় পর্যায়ে কিছু অনুরোধ থাকতে পারে। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিরা অনেক সময় কিছু অনুরোধ করেন, সেগুলো শুনতে হয়। তবে পুলিশকে কোনও কাজ করতে বা না করতে বাধ্য করার মতো সরাসরি হস্তক্ষেপ এখনও দেখা যাচ্ছে না।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ পুরোপুরি দূর হয়নি। থানায় মামলা গ্রহণে অনীহা রয়েছে। প্রভাবশালীদের চাপের কাছে পুলিশ অনেক সময় নতি স্বীকার করে। হেফাজতে আটক ব্যক্তির সঙ্গে আচরণ নিয়েও প্রশ্ন আছে। তদন্তের মান এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সমান সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তাও এখনও সাধারণ মানুষের কাছে অধরা।

তাদের মতে, স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা হয়নি। হেফাজতের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রেকর্ড সর্বত্র চালু হয়নি। তদন্ত এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজও আলাদা করা হয়নি। সরাসরি রাজনৈতিক চাপ কিছুটা কমে থাকতে পারে। কিন্তু পুলিশকে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষার স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনও তৈরি হয়নি।

সময়ের প্রয়োজন বলছেন শিক্ষাবিদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম মনে করেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের সময় এখনও আসেনি।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, “এত অল্প সময়ের মধ্যে কাঠামোগত সংস্কারের পূর্ণ মূল্যায়ন করা কঠিন। সরকারকে আরও কিছু সময় দেওয়া উচিত। তবে এখন পর্যন্ত আমার পর্যবেক্ষণ হলো, সরকার বিভিন্ন খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। কিন্তু দুর্নীতিতে আগ্রহী বিভিন্ন গোষ্ঠী ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারছে না।”

তিনি বলেন, “বড় প্রকল্পে অর্থ ব্যয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর এবং নিরাপত্তার নামে ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো বিষয়গুলো এখন আগের তুলনায় বেশি নজরদারিতে এসেছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে। তবে এখনও অনেক ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।”

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও একই সীমাবদ্ধতা দেখছেন তিনি। অধ্যাপক রেজাউল করিম বলেন, “অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও সরকার সতর্ক। সরকার অনেক কিছু করার চেষ্টা করছে। তাই সংস্কারের প্রকৃত ফলাফল বুঝতে আমাদের আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।”

দুদকের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন

দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারের প্রস্তাবে প্রতিষ্ঠানটিকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কমিশনার নিয়োগ, নিজস্ব জনবল ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধেও যেন প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে পারে, সেই নিশ্চয়তাও চাওয়া হয়েছিল।

কিন্তু প্রায় পাঁচ মাস আগে মার্চের শুরুতে ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন আকস্মিকভাবে বিদায় নিলেও এখনও নতুন কমিশন গঠিত হয়নি। দুদক সংস্কারে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশও বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

ফলে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানটি কী করবে? প্রভাবশালী আমলার বিরুদ্ধে তদন্ত কতটা স্বাধীনভাবে চলবে? অভিযোগ বাছাইয়ের মানদণ্ড কি প্রকাশ করা হবে? এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি।

নির্বাচন ও বিচারব্যবস্থার পরীক্ষা সামনে

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন স্বাধীন সচিবালয়, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কমিশনার নিয়োগ, রাজনৈতিক দলের অর্থায়নে জবাবদিহি, প্রার্থীদের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং অনিয়ম হলে ভোট বন্ধ করার কার্যকর ক্ষমতার সুপারিশ করেছিল।

নির্বাচনি পরিবেশে কিছু পরিবর্তন এসেছে। প্রতিযোগিতা বেড়েছে। আচরণবিধি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় কিছু সংশোধন হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন প্রশাসন ও পুলিশের ওপর কতটা কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে, ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে কতটা দৃঢ় থাকতে পারে এবং কমিশনার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব কতটা কমেছে— সেটিই হবে আসল পরীক্ষা।

বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন পৃথক সচিবালয়, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা, আদালতের বাজেট ও প্রশাসনে নির্বাহী প্রভাব কমানো এবং মামলাজট নিরসনের সুপারিশ করেছিল।

বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার সেটি আবার গুটিয়ে নিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিচার বিভাগ সংস্কারে আরও কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে বিচারক নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলার ওপর নির্বাহী প্রভাব পুরোপুরি দূর হয়েছে—এ কথা এখনও বলা যাচ্ছে না।

সংবিধানে ঐকমত্য, বাস্তবায়নে সংশয়

সংবিধান সংস্কার কমিশন প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ শিথিল এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।

কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়েছে। কিন্তু সংবিধান ও প্রয়োজনীয় আইন সংশোধন ছাড়া এসব প্রস্তাবের কার্যকারিতা থাকবে না। সংস্কারের বড় পরীক্ষা এখানেই। ক্ষমতাসীন দল নিজের ক্ষমতা কতটা সীমিত করবে?

এরই মধ্যে সরকার সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করেছে। বিরোধী দলও সংবিধান সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে সংশোধনের পরিধি, পদ্ধতি এবং সময়সীমা নিয়ে এখনও মতভেদ রয়েছে।

স্থানীয় সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরোনো ধারা

স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন আর্থিক ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, স্বাধীন স্থানীয় সরকার কমিশন গঠন এবং কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু অনেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত প্রতিনিধির বদলে প্রশাসক বসানো হয়েছে। এতে স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হওয়ার বদলে আমলানির্ভরতা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, প্রক্টর ও প্রভোস্ট বদলেছেন। কিছু ক্যাম্পাসে আগের দলীয় নিয়ন্ত্রণ ভেঙেছে। কিন্তু নিয়োগব্যবস্থা বদলায়নি। উপাচার্য নিয়োগ এখনও নির্বাহী সিদ্ধান্তনির্ভর। শিক্ষক নিয়োগে দলীয় প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগও রয়েছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়নি।

শিক্ষা খাতের বিষয়ে অধ্যাপক রেজাউল করিম বলেন, “শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের চেষ্টা হচ্ছে। বাজেট বাড়ানো হচ্ছে এবং বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষায় পদ্ধতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে আরও ফলপ্রসূ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ানো সংস্কার নয়। শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার মান, গবেষণা, পাঠ্যক্রম ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে বড় কাজ।”

অন্য খাতেও অগ্রগতি সীমিত

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন, মালিকানায় স্বচ্ছতা, সরকারি বিজ্ঞাপনের ন্যায্য বণ্টন এবং সাংবাদিকদের চাকরির নিরাপত্তার সুপারিশ করেছিল। স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা, রোগীর নিজস্ব ব্যয় কমানো এবং বেসরকারি হাসপাতালের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছিল। শ্রম সংস্কার কমিশন ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার, নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, ন্যায্য মজুরি এবং শ্রম আদালতের মামলাজট কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন সমান নাগরিক অধিকার, উত্তরাধিকারে নারীর ন্যায্য অংশ, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং বাল্যবিবাহসংক্রান্ত বৈষম্যমূলক বিধান সংস্কারের সুপারিশ করেছে।

এসব খাতে অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি হয়েছে। কিছু আইন ও বিধি সংশোধনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নাগরিকের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এখনও দৃশ্যমান নয়।