মাতৃদুগ্ধ পানে সহায়তা বাড়াতে জোরালো পদক্ষেপের আহ্বান

শিশুর জীবনের সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ সূচনা নিশ্চিত করতে মায়ের দুধ পানকে আরও কার্যকরভাবে উৎসাহিত ও সুরক্ষিত করার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফ।

বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ উপলক্ষে বাংলাদেশে ইউনিসেফের ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি জিলিয়ান মেলসপ এবং বাংলাদেশে ডব্লিউএইচওর প্রতিনিধি ডা. জামশেদ মোহাম্মদের যৌথ বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুর প্রয়োজনীয় পুষ্টির প্রধান উৎস মায়ের দুধ। এটি শিশুকে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে মায়েদের স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যানসার এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও কমাতে সহায়তা করে।

তবে বাংলাদেশে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতির গতি কমে গেছে। বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে শুধু মায়ের দুধ পান করার হার ২০১৯ সালের ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে।

একই সময়ে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো শুরু করার হারও ৪৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে।

ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ বলছে, মায়ের দুধ খাওয়ানো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও অনেক মায়ের জন্য এটি সহজ নয়। গর্ভাবস্থা থেকে সন্তান জন্মের পর পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তার অভাব, পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন সুবিধা না থাকা এবং স্তন্যদানের উপযোগী কর্মপরিবেশের অভাব এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। মায়ের দুধের বিকল্প শিশুখাদ্যের প্রচারও অনেক পরিবারের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।

জরুরি ও মানবিক সংকটের সময় এসব বাধা আরও তীব্র হয়ে দেখা দেয়।

এবারের বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহের প্রতিপাদ্য—‘জীবনের সূচনায় মাতৃদুগ্ধ পান: টেকসই উদ্যোগ করি বেগবান’। এই প্রেক্ষাপটে মায়ের দুধ পান নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগের পাশাপাশি ইতিমধ্যে কার্যকর কর্মসূচিগুলো আরও বিস্তৃত ও টেকসই করার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থা দুটি।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা, দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী, পরিবার ও সমাজের সহায়তা, শিশু-বান্ধব হাসপাতাল কর্মসূচি, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা এবং স্তন্যদানের উপযোগী কর্মপরিবেশ মায়ের দুধ পানের হার বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

মায়ের দুধ পান সহায়ক কার্যক্রমে প্রতি এক মার্কিন ডলার বিনিয়োগে প্রায় ৫৯ মার্কিন ডলার অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যেতে পারে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় কমানো, শিশুদের মেধার বিকাশ, শিক্ষায় ভালো ফল এবং ভবিষ্যতে আয় করার সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ সুফল আসে।

ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, স্বাস্থ্যকর্মী ও অন্যান্য অংশীজনকে মায়ের দুধ পান নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগগুলো আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে।

প্রত্যেক স্বাস্থ্যকর্মীর মায়ের দুধ পান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা নিশ্চিত করা, সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে শিশু-বান্ধব হাসপাতাল কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং এর বাস্তবায়নে জবাবদিহি ও কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কর্মজীবী মায়েদের জন্য বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি, মায়ের দুধ খাওয়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিরতি এবং উপযোগী কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া মাতৃদুগ্ধের বিকল্প ও শিশুখাদ্য বিপণন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৩ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব পণ্যের অনুপযুক্ত প্রচার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে মায়ের দুধ পান সংক্রান্ত সহায়তা যুক্ত করা এবং অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে আরও শক্তিশালী তথ্য, মনিটরিং ও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের শিশুদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগগুলোর একটি হলো মায়ের দুধ পানকে সুরক্ষা ও উৎসাহিত করা এবং মায়েদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা। এটি শিশুর জীবন রক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির উন্নয়ন, শেখার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রতিটি শিশুর জীবনের শুরুটা যেন সবচেয়ে ভালো হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সন্তানকে সফলভাবে মায়ের দুধ খাওয়াতে প্রতিটি মায়ের অধিকার ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি বলে জানিয়েছে ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফ।