রাজধানীর রামপুরা-বনশ্রী সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী মেরাদিয়া মাছের বাজার। প্রতিদিন ভোর থেকেই জমে ওঠে এই বাজারের কার্যক্রম। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হরেক রকমের তাজা মাছের পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। সপ্তাহের অন্যান্য দিনের চেয়ে ছুটির দিনে বাজারটিতে সাধারণ ক্রেতাদের উপস্থিতি থাকে চোখে পড়ার মতো, যার ফলে পুরো বাজার এলাকাজুড়ে নেমে আসে উৎসবমুখর ও জমজমাট পরিবেশ। গতকাল শুক্রবার (২২ আগস্ট) সরেজমিন এ দৃশ্য চোখে পড়ে।
শুধু বনশ্রীর বাসিন্দারাই নয়, আশপাশের আফতাবনগর, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা এখানে আসেন বাজার করতে। বিশেষ করে মাছ কিনতে। তাজা মাছের বিশাল সমাহার থাকায় লোকজনের চাহিদা এই বাজারটি।
তবে মাছ বেচাকেনার এই কর্মযজ্ঞের পেছনে লুকিয়ে আছে একদল মানুষের বেঁচে থাকার গল্প। বাজারজুড়ে ক্রেতাদের সুবিধার জন্য মাছ কেটে নির্দিষ্ট পারিশ্রমিকের বিনিময়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন প্রায় ৩০ জন নারী-পুরুষ। এদের মধ্যে নারীদের উপস্থিতি লক্ষণীয়। কঠোর পরিশ্রম আর নিজেদের মেধা ও দক্ষতা দিয়ে মাছ কেটে এখানে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন জোসনা বেগম, আনোয়ারা ও লতিফার মতো অনেক নারী।
প্রতিটি মাছের আকার ও ওজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে টাকা নিয়ে থাকেন তারা। এখান থেকে অর্জিত আয় দিয়েই চলে তাদের সংসার, পরিশোধ হয় সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ ও সংসারের যাবতীয় ব্যয়। গড়ে প্রতিদিন মাছ কেটে একজন ছাই-বটির কারিগর ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করেন। কোনও কোনও দিন এর চেয়েও বেশি হয়। তবে এখানকার খরচ মিটিয়ে মাস শেষে একেকজনের আয় দাঁড়ায় প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা।
সংসারের হাল ধরা জোসনা বেগম বলেন, ‘সংসারে অভাব-অনটন ছিল, কারও কাছে হাত না পেতে এখানে মাছ কাটার কাজ শুরু করি। প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হলেও এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। ছুটির দিনে বিশেষ করে শুক্রবারে অনেক ক্রেতা আসেন, কাজের চাপও বেশি থাকে। যা আয় করি তা দিয়ে মা-ছেলেকে নিয়ে ভালোভাবে সংসার চলে যায়।’
আরেক অভিজ্ঞ কারিগর আনোয়ারা বেগম বলেন, ‘এখানে আমরা সবাই মিলেমিশে কাজ করি। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সৎভাবে সংসার চালানোটা অনেক গর্বের। মাছ কাটার এই কাজটা আমাদের শুধু রুটি-রুজির সুযোগই করে দেয়নি, সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার আত্মবিশ্বাসও দিয়েছে।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের মতে, মেরাদিয়া বাজারে শুধু নিয়মিত মাছ বেচাকেনাই হয় না, প্রতি বুধবার এখানে বিশাল হাট বসে। হাটের দিনগুলোতেও বাজারের ব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। মাছ কাটার সাথে যুক্ত এই নারীরা পুরো এলাকার স্বাবলম্বী নারীশক্তির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন। কোনো বড় মূলধন ছাড়াই শুধু শারীরিক পরিশ্রম ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার এক অন্যরকম অনুপ্রেরণা তারা।