স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দেশত্যাগে আগ্রহী অভিবাসীদের মধ্যে ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। অনেকে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়ার জন্য অবৈধ পথ বেছে নেন। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অভিবাসী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে এটি বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করতে গন্তব্য দেশগুলোর সঙ্গে কাজ করছে সরকার।
শনিবার (২২ আগস্ট) জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশ ও ঢাকার ব্রিটিশ হাইকমিশনের সহায়তায় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে আয়োজিত ‘মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০২৬’ বিষয়ক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
কর্মশালায় জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মী ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। নতুন আইনি কাঠামো সম্পর্কে তাদের ধারণা আরও গভীর করার পাশাপাশি মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের ক্রমবর্ধমান জটিল ও আন্তঃদেশীয় প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ভুক্তভোগী ও সারভাইভারদের অভিজ্ঞতা, অধিকার ও সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
ড. মো. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যম ও প্রেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিষয়টি এবং এর বিভিন্ন দিক সম্পর্কে গণমাধ্যমের সুস্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এই আন্তঃদেশীয় ও সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এবং ২০২৬ সালের এই আইন প্রণয়ন সেই প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
কর্মশালায় জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম নতুন আইন বিষয়ে মূল সেশন পরিচালনা করেন। তিনি জানান, নতুন আইনে অভিবাসী চোরাচালানকে একটি পৃথক অধ্যায় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক প্রটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আইনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগত পরিবর্তনও আনা হয়েছে বলে জানান তিনি। মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও তদন্ত কর্মকর্তাদের ক্ষমতা সম্প্রসারিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ধর্ষণ ও হত্যার মতো আনুষঙ্গিক অপরাধ, যা আগে ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারের বাইরে ছিল, এখন সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক অপরাধ হিসেবে ট্রাইব্যুনালের বিচারকের মাধ্যমে বিচারযোগ্য করা হয়েছে।
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি-ইমিগ্রেশন) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবু নোমান একটি বিস্তারিত সেশন পরিচালনা করেন। সেখানে অপরাধী চক্রগুলো কীভাবে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে মানুষকে চোরাচালানের মাধ্যমে বিদেশে পাঠাচ্ছে, তা তুলে ধরা হয়।
তিনি বলেন, ভিসা সংগ্রহের জন্য জাল নথি তৈরি করা হচ্ছে। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করেও মিথ্যা তথ্য তৈরি করে মানুষকে পাচার করা হচ্ছে। এ অপরাধ প্রতিরোধে বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের বিদেশযাত্রা ঠেকানোসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে।
জিআইজেএনের বাংলা বিভাগের সম্পাদক মো. এস কে তানভীর মাহমুদ নৈতিক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বিষয়ে একটি সেশন পরিচালনা করেন। তিনি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিয়ে আলোচনা করেন। মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালানের ঘটনা নিয়ে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অনেক সময় অপরাধের দিকটি ভুক্তভোগীদের তুলনায় বেশি গুরুত্ব পায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কর্মশালার শেষ পর্বে বাস্তবভিত্তিক কেস আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। দিনব্যাপী আলোচনার বিষয়গুলো ভবিষ্যৎ প্রতিবেদনে প্রয়োগ করে মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বিষয়ে আরও তথ্যসমৃদ্ধ, দায়িত্বশীল ও সারভাইভার-কেন্দ্রিক প্রতিবেদন তৈরিতে ভূমিকা রাখার জন্য অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের আহ্বান জানানো হয়।