‘গ্যাস নিতেই রাত পার, কখন গাড়ি চালাবো আর কখন ঘুমাবো’

বুধবার রাত ১১টা। রাজধানীর মেরুল বাড্ডার জামান সিএনজি স্টেশন ঘেঁষে তখন হাতিরঝিলের ভেতরে প্রায় দুই কিলোমিটার লাইন। আরেকটি লাইন স্টেশনের সামনের দিকে বাড্ডার ইউলুপ পার হয়ে গেছে। অর্থাৎ স্টেশনটি ঘিরে চারপাশেই গাড়ির বিশাল সিরিয়াল। সিরিয়াল হলে কী হবে, গ্যাস তখনও দেওয়া শুরু হয়নি।

এই স্টেশনে গ্যাস নিতে আসা চালক রিপন বলেন, ‘এখন এখানে লাইনে রয়েছি। ১২টার দিকে গ্যাস দেওয়া শুরু হলে আমি সিরিয়াল পেতে পেতে আরও তিন ঘণ্টা। এরপর প্রেসার না থাকার কারণে ঠিকমত গ্যাস ঢোকে না। গ্যাস নিয়ে বাসায় যেতে যেতে ভোর হয়ে যাবে। গ্যাস নিতেই যদি রাত পার হয়, কখন গাড়ি চালাবো আর কখন ঘুমাবো।’

সরেজমিন দেখা গেছে, হাতিরঝিলের ওই সিরিয়াল প্রায় পুলিশ প্লাজার কাছাকাছি গিয়ে ঠেকেছে। এ কারণে বাড্ডা দিয়ে বের হওয়া গাড়িগুলো পড়েছে বিশাল জ্যামে। গ্যাস নেওয়া গাড়ির কারণে রাস্তা কমে যাওয়ায় স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি যেতে না পেরে ধীরে ধীরে আসতে হয় গাড়িগুলোকে। স্বাভাবিকভাবে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় যাত্রীদের।

গ্যাস পাম্পে গাড়ির সারি

এদিকে এমন অবস্থা চললেও তখনও গ্যাস দেওয়া শুরু করেনি পাম্পটি। কখন দিতে পারবে এটিও জানা না থাকার কারণে অনিশ্চিয়তা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছেন চালকরা।

অপেক্ষমান চালক সানাউল্লাহ জানান, রাত ৮টার পর তিনি হাতিরঝিলের ভেতরে সিরিয়াল দেন। রাত ১১টা বাজলেও গ্যাস পাননি। তিনি চাকরি করেন। মালিক তাকে পাঠিয়েছেন গ্যাস নিতে। গ্যাস কখন নেবেন আর কখন বাসায় যাবেন তা নিয়ে রয়েছেন দুঃশ্চিন্তায়।

তিনি বলেন, আগে কখনই এ রকম সমস্যা হয়নি। কিন্তু গত দুই মাস ধরে আমরা দুর্দশার মধ্যে রয়েছি। একবার গ্যাস নিতে এলে তিন-চার ঘণ্টা কখনও এর চেয়েও বেশি সময় লাগে।

তিনি বলেন, এখন গ্যাসের যা অবস্থা তাতে গাড়ি চালানই দায় হয়ে গেছে। তেলে গাড়ি চালালে পোশায় না। এক বা দুই হাজার টাকার তেল নিলে সারা দিন যায় না। ৬০০ টাকার গ্যাস নিলে দুই দিন যায়।

গ্যাসের জন্য অপেক্ষারত সিএনজি অটোরিকশা চালক রহিম বলেন, আমরা যেভাবে অপেক্ষা করি এমন পরিস্থিতি কোনও দিন হয়নি। চার-পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর ৫০-৮০ টাকার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এই গ্যাস দিয়ে বড়জোর তিনটি ট্রিপ মারতে পারবো তাও খুব বেশি দূরের ট্রিপ না। এরপর আবার লাইনে আসতে হবে। কোন স্টেশন গ্যাস দিচ্ছে সেটা মেপে সেখানেই যেতে হবে। তারপর আবারও তিন-চার ঘণ্টা অপেক্ষা।  

এদিকে খাঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেরুল বাড্ডা ছাড়াও মধ্যবাড্ডা, কুড়িল, খিলক্ষেত, উত্তরা, গাবতলী, তেজগাঁও, মহাখালী, মালিবাগ, মানিকনগর প্রায় সবখানেই ছিল একই রকম অবস্থা।

হাজিপাড়া পাম্পের সিরিয়াল দেখা যায় বিটিভি পর্যন্ত। রাত ৮-৯টায় এসে সিরিয়াল দিয়ে রেখেছেন কিন্তু ১১টা পর্যন্ত গ্যাস পাননি।

চালক সোহেল জানান, সকালে তিনি মদনপুর থেকে গ্যাস নিয়েছিলেন। সারা দিন চালানোর পর রাত সাড়ে ৮টার দিকে তিনি সিরিয়াল দেন।

তিনি বলেন, এখন গ্যাস নিতে নিতে যদি ভোর হয়ে যায় তাহলে সকালে আমি কীভাবে ডিউটি করবো।

তিনি আরও বলেন, গ্যাস সঙ্কটের কারণে আমরা যে কীভাবে চলছি তা আল্লাই ভালো বলতে পারবেন। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে, ডিউটি বন্ধ করে গ্যাস নিতেই আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পেই সময় দিচ্ছি।