অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রে এম এন লারমার দর্শন অনুসরণের আহ্বান

বিপ্লবী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ‘জাত্যাভিমানী সংবিধানের খেরোখাতায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রহমান মিলনায়তনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ৮৭তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটি-২০২৬ আয়োজিত সভায় সঞ্চালনা করেন কমিটির সদস্যসচিব মনিরা ত্রিপুরা। এতে বক্তব্য দেন লেখক, গবেষক ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আমেনা মহসিন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট ড. মারুফ মল্লিক, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী ড. ঈশিতা দস্তিদার এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের অর্থ সম্পাদক মেইনথিন প্রমীলা।

ড. আমেনা মহসিন বলেন, পাহাড়িদের অধিকার ও সংকটের বিষয়টি ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে সময় এম এন লারমা ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অধিকার তুলে ধরার পাশাপাশি সংবিধানের ত্রুটিগুলো বিশ্লেষণ করেছিলেন। সমসাময়িক সময়ের তুলনায় লারমা অনেক এগিয়ে ছিলেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী ড. ঈশিতা দস্তিদার বলেন, বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও অধিকারসংক্রান্ত নানা বিষয়ের সঙ্গে এম এন লারমার সংবিধান দর্শন যুক্ত ছিল, যা কোনওভাবেই বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়। বর্তমান পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে তার পরিবেশ ও প্রতিবেশ দর্শনেরও প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।

দীপায়ন খীসা বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার যে আলোচনা হচ্ছে, এম এন লারমা ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের সময়ই তা তুলে ধরেছিলেন। তার দাবি, বিএনপির ৩১ দফা ও ‘রেইনবো নেশন’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের বর্তমান নীতির অসঙ্গতি রয়েছে।

মেইনথিন প্রমীলা বলেন, বিভিন্ন ন্যারেটিভের মাধ্যমে আদিবাসীদের রাষ্ট্রীয় অধিকার আড়াল করার চেষ্টা করা হয়। সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের দখলদার চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের স্বার্থে এম এন লারমার সংবিধান দর্শন পর্যালোচনা করা উচিত।

ফিরোজ আহমেদ বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক একটি শ্রেণি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছে। স্বাধীনতার পর পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিকীকরণ ও সেটেলার পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এম এন লারমা বহুত্ববাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সাংবিধানিকভাবে সোচ্চার ছিলেন।

মারুফ মল্লিক বলেন, স্বাধীনতার পর সংবিধানে চাপিয়ে দেওয়া বাঙালি জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রে বহুত্ববাদী অন্তর্ভুক্তির পথে বাধা। ১৯৭২ সালে এম এন লারমার দেওয়া বক্তব্য বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যও প্রাসঙ্গিক। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর পুরোনো ভুল সংশোধনের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক পাভেল পার্থ। তিনি বলেন, এম এন লারমার সংবিধান দর্শনে জুম চাষ, কৃষি, রাজস্ব, উৎপাদনব্যবস্থা, পরিবেশ-প্রতিবেশ, শোষিত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং নারী প্রশ্ন গুরুত্ব পেয়েছে। তার মতে, এই দর্শন একটি বৈজ্ঞানিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের ধারণাকে ধারণ করে, যা বর্তমান সময়েও প্রাসঙ্গিক।

পাভেল পার্থ বলেন, পাকিস্তান আমলে কাপ্তাই বাঁধ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের ফলে জনপদ, চাষযোগ্য জমি ও প্রাকৃতিক প্রতিবেশ ধ্বংসের যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, এম এন লারমার পরিবেশ ও সমাজভাবনার বিকাশে তারও প্রভাব ছিল।

আদিবাসী স্বীকৃতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব বহু পুরোনো। এ বিষয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, আদিবাসী-বাঙালির ঐতিহাসিক সম্প্রীতির পরিবর্তে ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’সহ বিভিন্ন পরিচয়ের মাধ্যমে একটি বিভাজনমূলক বয়ান তৈরি করা হচ্ছে।/এএইচএস/এম/