পদ্মাপাড়ের বাজারে ‘মোদি-মুল্লুকের মাছলি’, রহস্যটা কী

ইলিশের বাজারে গিয়ে আপনি হয়তো দাম শুনে চমকে উঠবেন। এক কেজি বা তার বেশি ওজনের মাছ। বিক্রেতা বলছেন, পদ্মার ইলিশ। দাম ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা কেজি। মাছটি চকচকে, রুপালি। দেখলে ইলিশই মনে হয়। কিন্তু সেই মাছের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বাজারের ক্রেতাদের কেউ কেউ।

কারণ একই বাজারে ভারতীয় ইলিশও বিক্রি হচ্ছে। এক কেজি ওজনের ভারতীয় ইলিশের দাম ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা। অর্থাৎ একই আকারের দুই মাছের মধ্যে কেজিপ্রতি দামের ব্যবধান প্রায় ১ হাজার টাকা। আর ক্রেতার প্রশ্ন, যে মাছটি পদ্মার নামে কিনছেন, সেটি সত্যিই পদ্মার কি না?

এই প্রশ্নের সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে আরও একটি কৌতূহল। ভারতীয় সাংবাদিক শুভজ্যোতি ঘোষ বৃহস্পতিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) নিজের ফেসবুক আইডিতে ‘অথ ইলিশ রহস্য’ শিরোনামে একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের বাজারে এখন গুজরাটের নর্মদা মোহনা থেকে আসা ইলিশও পৌঁছাচ্ছে।

তার বর্ণনায়, ভারতের গুজরাটের ভারুচের কাছে নর্মদা নদী যেখানে আরব সাগরে মিশেছে, সেই মোহনার কাছে ইদানীং হাজার হাজার টন মাছ ধরা পড়ছে। স্থানীয়ভাবে সেটিকে ইলিশ বলা হলেও এর স্বাদ ও গড়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সেই মাছই নাকি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে বাংলাদেশের বাজারে।

গুজরাটের ভারুচ শহর সংলগ্ন এই মোহনাতেই মিলছে টনকে টন ইলিশ। ছবি: গুগল ম্যাপ

শুভজ্যোতি ঘোষ এই মাছকে মজা করে উল্লেখ করছেন ‘মোদি মুল্লুকের মাছলি’ অর্থাৎ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্যের মাছ হিসেবে। তার ভাষায়, বাংলাদেশের মানুষ পদ্মা-মেঘনা-মধুমতীর ইলিশে অভ্যস্ত। সেখানে গুজরাটের মাছের উপস্থিতি তাই বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।  প্রসঙ্গত, নরেন্দ্র মোদি একসময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।

কিন্তু গুজরাটের সেই ইলিশ বাংলাদেশে আসছে কেন?

ইলিশের ডিমের রহস্য

শুভজ্যোতি ঘোষের দেওয়া ব্যাখ্যার প্রথম কারণ ইলিশের ডিম। তার পোস্ট অনুযায়ী, গুজরাটের ইলিশ পেটমোটা এবং বর্ষার মৌসুমে এসব মাছে ডিমের পরিমাণও বেশি। আলাদা করে সেই ডিমের দাম অনেক ক্ষেত্রে পুরো মাছের চেয়েও বেশি।

বাংলাদেশ থেকে ইলিশের ডিম রফতানির বড় বাজার রয়েছে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে। তার দাবি, সেই বাজারের চাহিদা মেটাতে ব্যবসায়ীরা গুজরাটের ইলিশের ডিমও ব্যবহার করছেন। মাছের পেট কেটে ডিম বের করে নেওয়ার পর তা কুইক ফ্রিজ করে বাক্সবন্দী হয়ে পৌঁছে যাচ্ছে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস কিংবা লন্ডনের বেথনাল গ্রিনের সুপারস্টোরে।

তাহলে ডিম বের করে নেওয়ার পর বাকি মাছের কী হয়? সেখানেই আসে দ্বিতীয় কারণ শুঁটকি। শুভজ্যোতি ঘোষের পোস্টে ত্রিপুরার মেয়ে ও প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা অনিন্দিতার বক্তব্যের উল্লেখ রয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহত্তর ত্রিপুরায়; যার অংশ একসময় কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াও ছিল, নোনা ইলিশের চাহিদা রয়েছে।

ইলিশ চাকা চাকা করে কিংবা লম্বা করে কেটে প্রচুর নুন মাখিয়ে রোদে শুকিয়ে তৈরি করা হয় নোনা ইলিশ। কড়া স্বাদের এই শুকনো লবণাক্ত মাছ বাংলাদেশের বহু জেলাতেও জনপ্রিয়। ফলে গুজরাটের ইলিশ সর্ষেভাপে জায়গা না পেলেও শুঁটকির বাজারে জায়গা করে নিতে পারে বলে উঠে এসেছে ওই পোস্টে।

গুজরাটের ভারুচ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ইলিশ

তবে এখানেই শেষ নয়। বরং রহস্যের সবচেয়ে বড় জায়গাটি সম্ভবত বাংলাদেশের বাজারে।

পদ্মার নামে ভারতীয় ইলিশ?

রাজধানীর বাজারে উৎসভেদে ইলিশের দামে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি মিরপুর-১ নম্বর কাঁচাবাজারে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। এক কেজি বা তার বেশি ওজনের পদ্মার ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে। ৫০০ গ্রাম ওজনের পদ্মার ইলিশের দাম প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা কেজি।

বরিশালের ইলিশের দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা কেজি। এ দামে সাধারণত তিনটি ইলিশে এক কেজি বা কিছুটা বেশি ওজন হয়। এক কেজি ওজনের বরিশালের ইলিশের দাম ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা।

সাগরের ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি। এক কেজি ওজনের সাগরের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে।

অন্যদিকে এক কেজি ওজনের ভারতীয় ইলিশের দাম ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা। ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ভারতীয় ইলিশের দাম ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা।

মিয়ানমারের কোল্ডস্টোরেজে রাখা এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা কেজি। তিন থেকে চারটি মিলে এক কেজি হয়; এমন ইলিশের দাম ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি। অর্থাৎ বাজারে ইলিশ আছে অনেক উৎসের। কিন্তু সমস্যা হলো, ক্রেতার চোখে সব সময় উৎসের পার্থক্য ধরা পড়ে না।

‘সব একই লাগে’

মাছ ব্যবসায়ী মো. বাদল বলেন, বাজারে কোল্ডস্টোরেজে রাখা ইলিশও পাওয়া যাচ্ছে। এগুলোর দাম তুলনামূলক কম। পদ্মার ইলিশ বা ভালো মানের ইলিশের দাম বেশি। ভারতীয়, মিয়ানমারের ও সমুদ্রের ইলিশের দাম তুলনামূলক কম।

তাঁর ভাষ্য, বাজারে এখন চার-পাঁচ ধরনের ইলিশ রয়েছে। কোল্ডস্টোরেজে রাখা ইলিশ দেশি মাছও হতে পারে। মৌসুমে মাছ কিনে কোল্ডস্টোরেজে রাখা হয় এবং পরে দাম বাড়লে তা বিক্রি করা হয়। বর্তমানে কোল্ডস্টোরেজের ইলিশ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পদ্মার ইলিশের দাম ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা। অর্থাৎ একই আকারের ক্ষেত্রে পদ্মার ইলিশে কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।

বাদল আরও বলেন, ছোট আকারের সমুদ্রের ইলিশ ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এক কেজিতে তিন থেকে চারটি মাছ হয়। দুইটি মিলে এক কেজি হলে দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা।

ভারতীয় ইলিশের দাম এখন তুলনামূলক কম জানিয়ে তিনি বলেন, ৮০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ভারতীয় ইলিশ ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মিয়ানমারের ইলিশও বাজারে আসে, তবে পরিমাণ খুবই কম।

দেশি বা পদ্মার ইলিশের সঙ্গে ভারতীয় ইলিশের পার্থক্য বোঝা যায় দাবি করে বাদল বলেন, মাছের রং ও গড়নে পার্থক্য রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, পদ্মার ইলিশ দেখতে বেশি চকচকে ও সাদা, আর ভারতীয় বা সমুদ্রের ইলিশের রং ও গড়ন কিছুটা আলাদা।

আরব সাগরের মোহনায় ধরা পড়ছে টনকে টন ইলিশ (ছবি: সংগৃহীত)

কিন্তু এই পার্থক্য কতটা সহজে বোঝা যায় সাধারণ ক্রেতার পক্ষে? বাজার করতে আসা ক্রেতা কাওসার হোসেনের অভিজ্ঞতা বলছে, খুব একটা সহজ নয়।

তিনি বলেন, ইলিশ কিনতে গেলে প্রায় সব বিক্রেতাই তাদের মাছকে ভালো বলে দাবি করেন। কেউ বলেন পদ্মার ইলিশ, কেউ বরিশালের। আবার বাজারে সাগর ও ভারতীয় ইলিশও রয়েছে। কিন্তু কোনটি আসলে কোন এলাকার মাছ, তা তিনি বা মাছ কম চেনেন এমন ক্রেতারা সহজে বুঝতে পারেন না।

কাওসার বলেন, ‘দেখতে তো সব একই লাগে। বিক্রেতারা যা বলেন, তাদের কথার ওপর বিশ্বাস করেই কিনে নিই।’

ভারতীয় মাছ ঢুকছে কীভাবে?

মাছ বিক্রেতা সেন্টু বলেন, ভারত থেকে আসা ইলিশের একটি কার্টনে সাধারণত ৩০ কেজি মাছ থাকে। বাংলাদেশে ঢোকার সময় প্রতি কার্টনে ৭ হাজার ৫০০ টাকা কর দিতে হয়। তাঁর দাবি, ভারত থেকে আসা ইলিশের বেশিরভাগই ভালো মানের নয় এবং অনেক মাছই ডিমওয়ালা। তবে সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে ইলিশের উৎস ও মানের পার্থক্য সবসময় বোঝা সম্ভব নয়।

মিরপুরের বাজারে ইলিশ

মাছ বিক্রেতা যাদব রাজবংশী জানান, তিনি দুইবার ভারতীয় ইলিশ এনে বিক্রি করেছেন। প্রথম চালানে লোকসান হলেও দ্বিতীয় চালানে লোকসান হয়নি। তবে অনেক ক্রেতাই ভারতীয় ইলিশের স্বাদ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না বলে জানান তিনি।

যাদব বলেন, ভারতীয় ইলিশ দেশে আসতে এবং কাস্টমস প্রক্রিয়া শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগে। তাঁর দাবি, পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় এক মাস সময় লেগে যায়। এতে মাছের রং ও স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।

অন্যদিকে শুভজ্যোতি ঘোষের পোস্টে আরও গুরুতর একটি অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। তার দাবি, ঢাকার কাওরান বাজারের মাছ ব্যবসায়ীরা কেউ গুজরাটের ইলিশ বিক্রি করেন বলে স্বীকার করতে রাজি নন। তবে তার বিবিসি সহকর্মীরা কলকাতা ও ঢাকার মাছের আড়ত ঘুরে এমন সন্দেহের কথা জানিয়েছেন যে চাঁদপুর-বরিশালের ইলিশের সঙ্গে নর্মদা থেকে আসা ইলিশও মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে ক্রেতাদের খালি চোখে পার্থক্য ধরা পড়ছে না বলে ওই পোস্টে দাবি করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

দুই-তিন হাজার টাকার মাছ

শুভজ্যোতি ঘোষের পোস্টে বলা হয়েছে, গুজরাটের ভারুচের পাইকারি বাজারে মাত্র দু-চারশো টাকা কেজির মাছ বাংলাদেশে এসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ যে মাছ আরব সাগরের উপকূলে এত কম দামে বিক্রি হচ্ছে, সেটিই যদি পদ্মার ইলিশের পরিচয়ে বাংলাদেশের বাজারে ঢোকে, তাহলে দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

এখানেই ‘ইলিশ রহস্য’-এর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি। মাছের উৎস কি ক্রেতা নিশ্চিতভাবে জানতে পারছেন? পদ্মার নামে যে মাছ কিনছেন, সেটি সত্যিই পদ্মার কি না? ভারতীয় ইলিশ হলে সেটি ভারতীয় হিসেবেই বিক্রি হচ্ছে কি না? আর গুজরাটের নর্মদা মোহনার মাছ যদি বাংলাদেশের বাজারে আসে, সেটির পরিচয় কি ক্রেতাকে জানানো হচ্ছে? রাজধানী ঢাকার বাজারগুলোতে অন্তত ক্রেতাদের কথায় সেই নিশ্চয়তা নেই।

ইলিশের বাজারে তাই এখন শুধু স্বাদ, আকার কিংবা দাম নয়; প্রশ্ন উঠছে মাছটির পরিচয় নিয়েও। পদ্মার ইলিশের নামে যদি অন্য এলাকার মাছ বিক্রি হয়, তাহলে কেজিপ্রতি বাড়তি টাকা দিয়ে শেষ পর্যন্ত ক্রেতা কী কিনছেন—এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো ‘মোদি মুল্লুকের মাছলি’র রহস্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।