উপকূলে নিরাপদ পানি সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানি নিশ্চিতে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, স্থানীয় সরকার ও কমিউনিটির সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানানো হয়েছে। একইসঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে পরীক্ষিত জলবায়ু-সহনশীল পানি ব্যবস্থাপনার মডেল জাতীয় নীতি, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় ‘ন্যাশনাল কনক্লেভ অন ক্লাইমেট-রেজিলিয়েন্ট ওয়াটার সিকিউরিটি ফর কোস্টাল বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। সেভ দ্য চিলড্রেন ইন বাংলাদেশ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে বলা হয়, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা, বিশেষ করে সাতক্ষীরা, নিয়মিত ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও দীর্ঘস্থায়ী খরার মুখোমুখি হচ্ছে। এসব সংকট নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা, জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সাতক্ষীরা সদর ও আশাশুনি উপজেলায় ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ‘সাতক্ষীরা রেজিলিয়েন্ট ওয়াটার সিস্টেমস পাইলট প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সেভ দ্য চিলড্রেন কোরিয়ার অর্থায়নে, সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের কারিগরি সহায়তায় এবং উত্তরণের বাস্তবায়নে প্রকল্পটির আওতায় পাঁচটি সৌরবিদ্যুৎচালিত রিভার্স অসমোসিস (আরও) প্ল্যান্ট স্থাপন, পাঁচটি পন্ড স্যান্ড ফিল্টার পুনরুদ্ধার, ১০টি গভীর নলকূপ স্থাপন এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় কমিউনিটিভিত্তিক আয় ও ব্যবস্থাপনা কাঠামোও গড়ে তোলা হয়েছে। বর্তমানে এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ৪১ হাজারের বেশি মানুষ নিরাপদ পানি সেবা পাচ্ছেন, যাদের মধ্যে ১৬ হাজারের বেশি শিশু।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় রিমালের সময় পাঁচটি আরও প্ল্যান্টই জেনারেটরের মাধ্যমে সচল রাখা হয়েছিল। ঘূর্ণিঝড়ের পরপরই এসব প্ল্যান্টের মাধ্যমে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের কাছে নিরাপদ পানি পৌঁছে দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পাঁচটি আরও প্ল্যান্ট থেকে কমিউনিটিভিত্তিক আয় মডেলের মাধ্যমে ১৪ লাখ ৫৯ হাজার ২৪০ টাকা আয় হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎ খরচ প্রায় ৯০ শতাংশ কমেছে, ফলে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরতাও কমেছে।

অনুষ্ঠানে মাঠপর্যায়ের এই মডেলের অভিজ্ঞতা ও প্রমাণকে সরকারের কৌশলগত কাঠামো, জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা ও জলবায়ু নীতির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের পানি ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, জলবায়ু অর্থায়ন এবং বিভিন্ন খাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ সাইফুল্লাহ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি, বন্যা, লবণাক্ততা, তাপপ্রবাহ ও শৈত্যপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ খাবার পানির সংকট মানুষের স্বাস্থ্য ও সহনশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলছে।

তিনি বলেন, স্থানীয় মানুষ তাদের সমস্যা ও সমাধান সবচেয়ে ভালো বোঝেন। তাই স্থানীয়ভাবে পরিচালিত এ ধরনের উদ্যোগকে যথাযথ পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার একা নয়, স্থানীয় মানুষকে সমাধানের কেন্দ্রে রেখে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

সেভ দ্য চিলড্রেন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সুমন সেনগুপ্ত বলেন, সাতক্ষীরার মানুষের জন্য নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা একটি মৌলিক প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার, কমিউনিটি ও উন্নয়ন সহযোগীরা একসঙ্গে কাজ করলে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।

তিনি বলেন, সাতক্ষীরা রেজিলিয়েন্ট ওয়াটার সিস্টেমস পাইলট প্রকল্প জাতীয় পর্যায়ের লক্ষ্য ও স্থানীয়ভাবে পরিচালিত সমাধানের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছে। এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উপকূলীয় মানুষের প্রয়োজনভিত্তিক নিরাপদ পানি সেবা আরও সম্প্রসারণ করা সম্ভব।