মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক উদ্ভাবন প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন জাবির শিক্ষার্থী

বাংলাদেশের তরুণদের উদ্ভাবনী সক্ষমতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে মালয়েশিয়ায়। কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত ইউনিভার্সিটি রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন ইনভেস্টমেন্ট সামিট (ইউআরআইআইএস) ২০২৬-এর ‘স্টুডেন্টস বিজ ইনোভ চ্যালেঞ্জ ২০২৬’-এ চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণ উদ্ভাবক ইফতেখার সাফিন।

২৩ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে (ডব্লিউটিসিকেএল) অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে সরাসরি উপস্থিত হয়ে নিজের প্রকল্প উপস্থাপন করেন তিনি। বিভিন্ন ধাপের বাছাই পেরিয়ে এশিয়ার শীর্ষ তিন চূড়ান্ত প্রতিযোগীর একজন হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। শেষ পর্যন্ত বিচারকদের সামনে প্রকল্প উপস্থাপন করে অর্জন করেন ‘চ্যাম্পিয়ন—স্টুডেন্টস বিজ ইনোভ চ্যালেঞ্জ ২০২৬’ পুরস্কার।

ইফতেখার সাফিন জানান, তিনি বাংলাদেশ থেকে কোনো প্রতিষ্ঠান, সংগঠন কিংবা ব্যক্তির মাধ্যমে নয়, সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে প্রতিযোগিতাটিতে আবেদন করেন। কয়েক ধাপের বাছাইপ্রক্রিয়া অতিক্রম করে এশিয়ার শীর্ষ তিন চূড়ান্ত প্রতিযোগীর একজন হিসেবে নির্বাচিত হন।

এই নির্বাচনের ভিত্তিতে মালয়েশিয়ায় প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেওয়ার জন্য তিনি সম্পূর্ণ অর্থায়িত অংশগ্রহণের সুযোগ পান। এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত সরাসরি চূড়ান্ত পর্বে বাংলাদেশ থেকে একাই শারীরিকভাবে উপস্থিত হয়ে নিজের উদ্ভাবনী প্রকল্প উপস্থাপন করেন।

ইফতেখার সাফিনের বিজয়ী প্রকল্পের নাম ‘স্কিলব্রিজ আইএসএ’। এর পূর্ণাঙ্গ ধারণা হলো—শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে ‘ইনকাম শেয়ার আর্কিটেকচার’ বা আয়ের অংশীদারত্বভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে সেতুবন্ধন তৈরি করা।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য উচ্চশিক্ষা ও বাস্তব চাকরির বাজারের মধ্যে থাকা দক্ষতার ঘাটতি কমানো। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সামনে থাকা আর্থিক বাধা দূর করার একটি গবেষণাভিত্তিক ব্যবসায়িক ও আর্থিক মডেল তৈরি করা হয়েছে এতে।

এই মডেলে শিক্ষার্থীদের শুরুতেই কোনো কোর্স ফি দিতে হবে না। বরং তারা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন অনুযায়ী চাকরির উপযোগী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রশিক্ষণে অর্থায়ন করতে পারবে। পরে প্রশিক্ষণ নেওয়া শিক্ষার্থী চাকরি পাওয়ার পর তার আয় থেকে সহজ কিস্তিতে সেই প্রশিক্ষণের খরচ পরিশোধ করবে।

অর্থাৎ, প্রকল্পটির মূল ধারণা—আগে দক্ষতা অর্জন, এরপর কর্মসংস্থান এবং সবশেষে আয়ের সঙ্গে যুক্ত করে প্রশিক্ষণ ব্যয় পরিশোধ।

ইফতেখারের পরিকল্পিত মডেলটি ব্যয়বহুল প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল নয়। বিদ্যমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে তুলনামূলক কম খরচে এবং বৃহৎ পরিসরে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তার মতে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যকার দূরত্ব কমাতে হলে শুধু শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তোলাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে দক্ষতা অর্জনের খরচ বহনের সক্ষমতা এবং চাকরির বাজারের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গেও প্রশিক্ষণকে যুক্ত করতে হবে। ‘স্কিলব্রিজ আইএসএ’ সেই জায়গাতেই একটি বিকল্প কাঠামো প্রস্তাব করছে।

ইউনিভার্সিটি রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন ইনভেস্টমেন্ট সামিট—ইউআরআইআইএস ২০২৬ মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয় (এমওএইচই) এবং উচ্চশিক্ষা বিভাগের (জেপিটি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাতীয় পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা, উদ্ভাবন ও বিনিয়োগভিত্তিক একটি প্ল্যাটফর্ম।

২১ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর কুয়ালালামপুরের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে অনুষ্ঠিত এবারের আয়োজনে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি শিল্প খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি, বিনিয়োগকারী, সরকারি সংস্থা, গবেষক ও উদ্ভাবকেরা অংশ নেন। মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবারের আয়োজনে এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী এবং ২০টির বেশি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অংশ নেয়।

এমন একটি আন্তর্জাতিক আয়োজনের শিক্ষার্থীভিত্তিক উদ্ভাবন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে এককভাবে অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়াকে দেশের তরুণ উদ্ভাবকদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখছেন ইফতেখার।

নিজের এই অর্জনকে শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখতে চান না ইফতেখার সাফিন। তার প্রত্যাশা, বাংলাদেশের আরও বেশি শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সাহস পাবে, নিজেদের ধারণা ও উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করবে এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন দেখবে।

ইফতেখার বলেন, বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পাওয়ার আনন্দের পাশাপাশি এই অর্জনের সবচেয়ে বড় মূল্য হবে তখনই, যখন তার গল্প আরও তরুণকে অনুপ্রাণিত করবে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অংশ নেওয়ার সাহস, নিজের ধারণা নিয়ে কাজ করার আগ্রহ এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন—এই তিনটি বিষয়েই তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান তার।

ইউআরআইআইএস ২০২৬-এর বিভিন্ন মুহূর্তের ভিডিও, গ্র্যান্ড ফিনালে তার প্রকল্প উপস্থাপনা এবং পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের কিছু অংশও তিনি সংরক্ষণ করেছেন। পাশাপাশি আয়োজকদের অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার ও মিডিয়া টিমের ধারণ করা আরও কিছু ছবি ও ভিডিও পরবর্তীতে পাওয়ার কথা রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থীর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন অর্জন শুধু একটি পুরস্কার পাওয়ার ঘটনা নয়; একই সঙ্গে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানকে নতুন আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে যুক্ত করার একটি ধারণাকেও আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে।