আজ হয়তো এমন শিক্ষকদের নিয়েই বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হচ্ছে, যারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষকতা করেন। যারা শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে পাঠ্যবই থেকে জীবনের নানা বিষয়ে পথ দেখান। নিঃসন্দেহে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু সত্যি বলতে, যে শিক্ষকের শিক্ষা আমাদের জীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে, তিনি হলেন মা। অন্তত আমার জীবনের কথা বলতে গেলে এ বিষয়ে আমার কোনও দ্বিধা নেই যে, আমার মা-ই আমার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক।
জীবনের মধ্য বয়সে এসে এখন পেছনে ফিরে তাকালে দেখি, এর মধ্যে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ হয়েছে। অনেক শিক্ষকের কাছ থেকে শিক্ষার আলো পেয়েছি। পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও তাদের কাছ থেকে শিখেছি মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয়, বড়দের কীভাবে সম্মান ও ছোটদের স্নেহ করতে হয়, ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত- এমন অসংখ্য বিষয়। এজন্য তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা সবসময়ই থাকে।
কিন্তু জীবনের খুঁটিনাটি এমন কিছু শিক্ষা আছে, যেগুলো মা না শেখালে হয়তো কখনও বুঝতেই পারতাম না যে, এগুলোও আসলে শিক্ষার অংশ। ঘর গোছানো, পরিচ্ছন্ন থাকা, নিজের কাজ নিজে করা, বড়দের সম্মান করা, তাদের সামনে সংযত থাকা- এসব খুব সাধারণ বিষয় মনে হলেও মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে এর প্রভাব অনেক গভীরে। এসব শিক্ষা আসলে হাতেকলমে সর্বপ্রথম আমি পেয়েছি আমার মায়ের কাছ থেকে।
আমি গ্রামে বড় হয়েছি। আমার মা-ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার তেমন সুযোগ পাননি। গ্রামের একজন খুবই সাধারণ মানুষ তিনি। কিন্তু জীবনের শিক্ষা যে শুধু বই পড়ে অর্জন করতে হয় না, আমার মা তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। আমরা পাঁচ ভাই-বোন। আমাদের সবাইকে পড়াশোনা করিয়েছেন। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সন্তানদের শিক্ষিত করার বিষয়ে তার আগ্রহ ও চেষ্টা ছিল অসাধারণ। তিনি আমার বাবার উত্তম সহযাত্রী ছিলেন এক্ষেত্রে।
মা আমাদের শাসন করেছেন, তবে সেই শাসনে কখনো কটূক্তি ছিল না, অপমান ছিল না। ভুল করলে স্বাভাবিকভাবে ধমক দিয়েছেন, বুঝিয়েছেন। কখনও এমন কোনও কথা বলেননি, যা সন্তানের আত্মসম্মানে আঘাত করে। তার শাসনের মধ্যেও ছিল মমতা, আর মমতার মধ্যেই ছিল এক ধরনের নীরব শিক্ষা।
অনেক পরিচিত বন্ধু-স্বজনকে দেখি, তাদের মধ্যে ছোটখাটো বিষয়েও অসাবধানতা রয়েছে। ঘর অগোছালো রাখা, পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে উদাসীন থাকা কিংবা বড়দের সঙ্গে আচরণে প্রয়োজনীয় সংযম না থাকা- এসব বিষয় শতবার বললেও তারা অনেক সময় ঠিক করতে পারেন না। পরে মনে হয়, হয়তো শৈশবে তারা এসব শেখার সুযোগই পাননি।
আমার মা আমাদের এসব শিখিয়েছেন খুব স্বাভাবিকভাবে। আলাদা করে কখনও বলেননি, ‘এটা তোমার শিক্ষা।’ তিনি নিজে যেভাবে চলেছেন, আমরাও সেভাবেই শিখেছি। তার জীবনযাপনই ছিল আমাদের পাঠ্যবই, তার আচরণই ছিল আমাদের শিক্ষা।
তাই আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে বলি- আমার জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী শিক্ষক আমার মা। তিনি হয়তো বড় কোনো ডিগ্রি অর্জন করেননি, কিন্তু আমাদের জীবনের যে শিক্ষাগুলো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে, সেসবের বড় অংশই তার কাছ থেকে পাওয়া।
আসলে আমার মা আমার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক- এ কথা বলার জন্য কোনও বিশেষ দিনের প্রয়োজন নেই। তবে শিক্ষক দিবস উপলক্ষে মায়ের কথাটি স্মৃতিপটে ভেসে উঠল। আমার মা সুস্থ ও সততার সঙ্গে দীর্ঘজীবী হোন- সকলের কাছে এই দোয়া কামনা করি।