বাংলাদেশে কারা আদিবাসী? 

দেশে বাঙালি জনগোষ্ঠীর বাইরে যে ৫০টির বেশি ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠী বসবাস করে, তারাই ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচিত। যদিও সংবিধানে তাদের ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ বা ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ বলা হয়। সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদ ‘আদিবাসী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি সংরক্ষণের’ কথা বলা হয়েছে। তবে তাদের অধিকার রক্ষায় ‘আদিবাসী’ হিসেবেই সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, আদিবাসী হলো— এমন এক সাংস্কৃতিকভাবে স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী যারা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের প্রাচীনতম বাসিন্দাদের বংশধর এবং ঔপনিবেশিক বাস আধিপত্যবাদী সমাজের প্রভাবে নিজেদের মূল রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতা হারিয়ে প্রান্তিক অবস্থায় রয়েছে।

জনসংখ্যা কত?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী, দেশে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৮ জন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ০.৯৯ শতাংশ। আদিবাসী সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী এই সংখ্যা ৩০ লাখের কাছাকাছি। বিবিএস-এর তালিকায় ৫১টি নৃ-গোষ্ঠীর উল্লেখ আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা সবচেয়ে বড়, এরপর আছে মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, চাক, খেয়াং, খুমি, লুসাই, পাংখোয়া সম্প্রদায় আছে। এদের বড় অংশ বসবাস করেন রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায়।

সমতলে বলতে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে সাঁওতাল, গারো বা আ·চিক, ওঁরাও, মুন্ডা, কোচ, হাজং, খাসি, মণিপুরী, রাখাইন, বর্মন, কোল, ভূমিজসহ আরও অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী আছেন।

পাহাড় থেকে সমতলের পার্থক্য কোথায়?

নৃতত্ত্ববিদদের মতে, সমতলের সাঁওতাল, কোল, ভূমিজ, মুন্ডা, মালপাহাড়ি এরা অস্ট্রিক নরগোষ্ঠীভুক্ত— যাদের এই বাংলা অঞ্চলের প্রাচীনতম আদিবাসী বলা হয়। আর পাহাড়িয়া ও ওঁরাও গোষ্ঠী দ্রাবিড় জনধারা থেকে উদ্ভূত।

জীবনযাপনেও পার্থক্য স্পষ্ট। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী যেখানে জুমচাষের উপর নির্ভরশীল, সেখানে সমতলের আদিবাসীরা মূলত সমতল ভূমিতে কৃষি কাজ ও দিনমজুরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। রাজশাহীর গোদাগাড়ী থেকে দিনাজপুরের বিরল— উত্তরবঙ্গের ধানের মাঠে যারা হাজার বছর ধরে হাল ধরেছে, তাদের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য ভাবে আছে সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা, মাহালি, মালো, রাজবংশী, কোচ ও পলিয়া— সমতলের আদিবাসী। কিন্তু তাদের ধর্ম, সমাজ আর সংস্কৃতি একে অপরের থেকে আকাশ-পাতাল আলাদা। সেই বৈচিত্র্যই আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে, কারণ সংবিধানে তাদের আদিবাসী হিসেবে কোনো স্বীকৃতি নেই।

উত্তরবঙ্গজুড়ে তাদের আবাস

দিনাজপুর-ঠাকুরগাঁও সদর, বিরল, বীরগঞ্জ, রানীশংকৈল, আটোয়ারীতে সাঁওতাল ও ওঁরাওদের সবচেয়ে ঘন বসতি। রাজশাহী-নওগাঁর গোদাগাড়ী, তানোর, নিয়ামতপুর, পত্নীতলা, নাচোলে বরেন্দ্রর লাল মাটির আদি চাষী সাঁওতালরা। এখানকার অনেক দেশি ধানের বীজ এখনো সাঁওতাল নারীরা মাটির হাঁড়িতে সংরক্ষণ করে।

রংপুর-গাইবান্ধার বদরগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ, সৈয়দপুর, কুড়িগ্রামে ওঁরাও, মুন্ডা, রাজবংশী, কোচদের বাস। গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মে ২০১৬ সালে সাঁওতাল উচ্ছেদের পর এই অঞ্চল আলোচনায় আসে।

ভেতরের ভিন্ন ভিন্ন বৈচিত্র্য

উত্তরবঙ্গের সমতলের আদিবাসীরা এক ধর্মের মানুষ নয়। সাঁওতাল, মুন্ডা, মাহালিরা এখনো সারনা ধর্ম পালন করে। অন্যদিকে রাজবংশী, কোচরা লোক-হিন্দু ধর্ম পালন করে। আর ঠাকুরগাঁও- নীলফামারী বেল্টে ওঁরাওদের প্রায় ৭০ শতাংশ এখন খ্রিস্টান। ফলে একই গ্রামে এক বাড়িতে সারনা পূজা, পাশের বাড়িতে রবিবারের প্রার্থনা, দুটোই চলে।

তাদের সমাজ-কাঠামো বাঙালি সমাজ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সাঁওতালদের প্রতিটি গ্রামকে বলা হয় আতো, গ্রাম প্রধান মাঝি এবং কয়েকটি গ্রাম নিয়ে পরগানা—যার প্রধান পরগনাইত। চুরি, বিয়ে, জমির বিরোধ তারা নিজস্ব আদালতে মেটায়, প্রচলিত কোর্টে যাওয়ার হার খুবই কম। ওঁরাও সমাজে গ্রাম প্রধান মাহাতো আর পুরোহিত পাহান, যিনি ফসল ও বৃষ্টির পূজা করেন।

ভাষাতেই তাদের সবচেয়ে বড় বৈচিত্র্য

সাঁওতালি, মুন্ডারি অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা পরিবারের, ওঁরাওদের কুড়ুখ ভাষা দ্রাবিড়ীয় পরিবারের— যা তামিলের দূর আত্মীয়, আর রাজবংশীদের ভাষা ইন্দো-আর্য। ফলে এক সাঁওতাল আরেক ওঁরাওয়ের ভাষা বোঝে না। উৎসবেও তাই সাঁওতালদের সোহরাই উৎসবে গরুকে সম্মান জানানো হয়, বাহা উৎসবে ফুলকে। ওঁরাওদের কারাম উৎসবে কারাম গাছের ডাল পুঁতে ভাই-বোনের বন্ধন উদযাপন করা হয়। তাদের বাদ্যযন্ত্র ঢোল নয়, মাদল, ধামসা ও বানাম।

পাহাড়ের জুম চাষ নয়, উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা বরেন্দ্রর হাল-চাষী। তাদের প্রাকৃতিক জ্ঞান হাজার বছরের। কোন মাটিতে কোন দেশি ধান হবে, তা তারা মাটি দেখেই বলে দিতে পারে। সাঁওতাল নারীরা এখনো মাটির হাঁড়িতে নিমপাতা দিয়ে বীজ সংরক্ষণ করে, যাতে পোকা না ধরে— যা আধুনিক কৃষি বিজ্ঞানও স্বীকার করে। ওঁরাওরা তিস্তা পাড়ের বন্যা ও হাতি চলাচলের পথ দেখে আবহাওয়া আন্দাজ করে। তাদের মাটির দোতলা ঘর গরমে ঠান্ডা, শীতে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে।

কেন স্বীকৃতি জরুরি?

সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে তাদের উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বলা হয়েছে।  আদিবাসী শব্দ নেই। সরকারের যুক্তি,  আদিবাসী বললে স্বাধিকারের দাবি উঠতে পারে। কিন্তু মাঠের মানুষের যুক্তি ভিন্ন।

গোদাগাড়ীর সাঁওতাল কৃষক হেমব্রম মার্ডি বলেন, ‘‘আমার দাদার দাদা এই জমি চাষ করেছে। কাগজে নাম মহাজনের। আদিবাসী স্বীকৃতি থাকলে আমাদের জমির অধিকার আইনে রক্ষা পেতো।’’ নৃবিজ্ঞানীরা বলছেন, স্বীকৃতি মানে শুধু নাম নয়। আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে আন্তর্জাতিক আইনে তাদের প্রথাগত জমি রক্ষা, মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা এবং কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের আগে তাদের সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক হয়। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তকমায় তা হয় না।

ক্রিশ্চিয়ান এইডের এশিয়া মাল্টি-কান্ট্রি ক্লাস্টার (এমসিসি) প্রোগ্রাম অ্যান্ড পার্টনারশিপ লিড প্রিন্স সুমন বাড়ৈ বলেন, ‘‘আদিবাসী শব্দের সংজ্ঞাই পাল্টে দিয়ে বলা হচ্ছে, আদিবাসী মানে যারা আগে থেকে বসবাস করছে। এই যুক্তিতে অনেক সময় বলা হয় বাঙালিরাই আদিবাসী। এই ব্যাখ্যা মোটেও ঠিক নয়। আদিবাসী শব্দটি ইংরেজি Indigenous শব্দের বাংলা রূপ। Indigenous মানে শুধু আগে থেকে বসবাসকারী নয়। আদিবাসী মানে এমন এক জনগোষ্ঠী যাদের পৃথক ভাষা আছে, পৃথক সংস্কৃতি আছে, নিজস্ব রীতিনীতি, আচার-প্রথা আছে— যা মূলধারার বাঙালি জনগোষ্ঠী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।’’

তার মতে, আদিবাসীদের নিজস্ব মাতৃভাষা রয়েছে, নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে, এমনকি চেহারাগত বৈশিষ্ট্যও আলাদা। এই বাস্তবতাকে যখন অস্বীকার করা হয়, তখন আসলে তাদের অস্তিত্বকেই, তাদের সত্তাকেই অস্বীকার করা হয়। আর সত্তাকে অস্বীকার করে কখনোই অধিকার নিশ্চিত করা যায় না।

তিনি বলেন, ‘‘আদিবাসীদের অধিকার পুরোপুরিভাবে রক্ষা করা হচ্ছে না, কারণ প্রথমেই তাদের আদিবাসী হিসেবে যে স্বীকৃতি, সেটাই সরকার থেকে দেওয়া হচ্ছে না। যেখানে স্বীকৃতিই নেই, সেখানে বাকি অধিকার সেভাবে আসে না।’’

‘আমরাই পারি’র প্রধান নির্বাহী জিনাত আরা হক বলেন, ‘‘আদিবাসীদের সবচেয়ে বড় সংকট ‘পরিচয়’। আদিবাসী হিসেবে তাদের যে স্বীকৃতি, সেটাই তো নেই। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এ নিয়ে লড়াই করছি। সরকার বলছে, ওরা আদিবাসী না, ওরা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। এক ধরনের পরিচয়হীনতার সংকট থেকেই তাদের বঞ্চনা শুরু। সমতল আদিবাসীরা কোন কোন জায়গায় বঞ্চিত, সেই জায়গাটাই এখনোস আইডেন্টিফাই করা হয়নি। যখন কোন জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার কথা বলা হয়, তখন প্রথমে দেখতে হবে তারা কোথায় কোথায় বঞ্চিত হচ্ছে।’’

আইনজীবী অ্যাডভোকেট প্রমিলা টুডো বলেন, ‘‘আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সাংবিধানিক স্বীকৃতি অতি জরুরি। রাষ্ট্রীয়ভাবে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি না থাকায় প্রতিনিয়ত পরিচয় সংকট ও নানা ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে এই জনগোষ্ঠীকে। সংবিধান বা রাষ্ট্র যদি আমাকে পরিচয় না দেয়, তখন আমি সব ক্ষেত্রেই নিজের পরিচয় দিতে দ্বিধায় ভুগবো।’’

তিনি বলেন, ‘‘সংবিধানেক্ষুদ্র জাতিসত্তা বলা হলেও আদিবাসী শব্দটি নেই। এতে করে বাঙালি জাতির মধ্যে আদিবাসীদের যে আলাদা সংস্কৃতি, ভাষা, সামাজিক কাঠামো আছে সেটা প্রকাশ পায় না।’’

তিনি বলেন, ‘‘অনেকেই ভুল বোঝেন যে আদিবাসী স্বীকৃতি মানে রাষ্ট্রের কোনো অংশ দখল করা। আসলে বিষয়টি তা নয়, বরং নিজস্ব সংস্কৃতি ও পরিচয় নিয়ে দেশের নাগরিক হিসেবে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচা।’’