রোমানিয়ায় বাংলাদেশিদের ওপর অনাস্থা বাড়ছে কেন

ইউরোপে বাংলাদেশি শ্রম অভিবাসন নিয়ে প্রকাশিত নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে রোমানিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিদের প্রতি চরম বেতন ও  সামাজিক বৈষম্য এবং ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহারের মানসিকতার ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) প্রকাশিত ক্যাসল ২ (ঝুঁকির মুখে থাকা ব্যক্তিদের সহায়তা করা) এর ওপেনিং রিপোর্ট অনুযায়ী, রোমানিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের ৯৮ শতাংশ পুরুষ— তারা মূলত তরুণ এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও কম।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রোমানিয়ার নিয়োগকর্তারা বাংলাদেশিদের  বদলে নেপালি কর্মীদের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে আইসিএমপিডি, বেব এস-বোলিয়াই  বিশ্ববিদ্যালয় এবং টেরে ডে হোমস। 

প্রতিবেদনে রোমানিয়ায় কর্মরত ফাহিম নামে এক বাংলাদেশি অভিবাসীর বক্তব্য সরাসরি তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ফাহিম উল্লেখ করেন, ‘আমরা একই কাজ করি। কিন্তু তারা আমাদের রোমানিয়ানদের চেয়ে কম বেতন দেয়... বড় পার্থক্য আছে। আমি পাই ৮০ হাজার টাকা; রোমানিয়ান শ্রমিকরা পায় ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। উল্টো আমি তাদের চেয়ে বেশি কাজ করি। সবাই আমাকে দিয়ে কাজ করায়।’’

তার অভিযোগ, বাংলাদেশিদের দিয়ে বেশি সময় কাজ করানো হয় কোনও বাড়তি সুবিধা ছাড়াই।

বাংলাদেশিদের প্রতি অনাস্থা, নেপালিদের প্রতি ঝোঁক

রিপোর্টের তথ্য বলছে, রোমানিয়ার নিয়োগকর্তারা এখন বাংলাদেশিদের চেয়ে নেপালি শ্রমিকদের বেশি পছন্দ করছেন। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশিরা রোমানিয়াকে ইউরোপের অন্য দেশে, বিশেষ করে ইতালিতে যাওয়ার ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করেন।

ফাহিমের ভাষায়, ‘‘বাংলাদেশিরা এখানে এলে ইতালি চলে যায়। তারা মনে করে, ইতালি ভালো। কেউ থাকতে চায় না। আমরা ১০০ জন এসেছিলাম। এখন আছি ২০ জন। ৮০ জন চলে গেছে। কেউ অন্য দেশে অবৈধভাবে আছে।’’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কুলে বাংলাদেশি শিশুরা ভাষা ও জাতিগত কারণে বৈষম্যের শিকার হয়। রাজনৈতিক ব্যানারে ‘এটা বাংলাদেশ নয়’ লিখে বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব ছড়ানো হয়, যা অভিবাসীদের মধ্যে ‘কোণঠাসা’ করে রাখার অনুভূতি তৈরি করে।

দেশে ফেলে আসা পরিবারে প্রভাব

বাংলাদেশে থাকা নারীদের ওপর বোঝা বেড়েছে। স্বামী বিদেশে থাকায় তাদের ঘরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা, সন্তানের পড়াশোনা, নির্মাণ কাজ সব সামলাতে হচ্ছে। একজন ৩৫ বছরের নারী হিয়া বলেন, ‘‘আমাকে সংসার চালাতে কাজ করতে হয়।’’ তবে অন্যদিকে সামাজিক মর্যাদা বেড়েছে বলেও অনেকে জানিয়েছেন। এক নারী বলেন, ‘‘আগে যখন দুবাই বা সৌদি আরবে ছিল, তখন একরকম দেখতো। এখন ইউরোপে বলে মানুষ আগের চেয়ে বেশি সম্মান দেয়।’’

রোমানিয়ার আবহাওয়া নিয়েও অভিযোগ আছে। ফাহিম বলেন, ‘‘সূর্য কম ওঠে। শীতকালে বেশিরভাগ সময় অন্ধকার থাকে। রাতে বেশি ঠান্ডা। আমার ভালো লাগে না।’’ পর্তুগালের আবহাওয়া বাংলাদেশের মতো বলে সেখানে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন অনেকে।

রিপোর্টে সুপারিশ হিসেবে বলা হয়েছে, অভিবাসনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দালালদের দ্বারা শোষণ, উচ্চ খরচ এবং তথ্যের অভাব বাংলাদেশি পরিবারগুলোকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। শুধু রেমিট্যান্স নয়, পেছনে ফেলে আসা পরিবারের জন্য আনুষ্ঠানিক সহায়তা ব্যবস্থা এবং গন্তব্য দেশে শক্তিশালী ইন্টিগ্রেশন নীতি জরুরি, না হলে এই দুর্দশার চক্র চলতেই থাকবে। 

রিপোর্টে বলা হয়েছে, আইনি প্রক্রিয়ায় ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, নাগরিকত্ব এবং পারিবারিক ভিসা পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। খরচ বেশি, প্রক্রিয়া অনিশ্চিত। এক ভুক্তভোগী ইমরানের ছেলের গ্রিসের স্টুডেন্ট ভিসার উদাহরণ টেনে বলা হয়েছে, গ্লোবাল নামে একটি ভিসা প্রসেসিং কোম্পানিতে কাগজ জমা দেওয়ার পর এক বছরের বেশি সময়েও ভিসা আসেনি।

এই জটিলতার কারণে বেশিরভাগ মানুষ বাধ্য হয়ে অনানুষ্ঠানিক পথ বেছে নিচ্ছে। আত্মীয়-স্বজন, পরিচিত জন, দালাল বা ব্রোকারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আর এই সুযোগেই বাড়ছে শোষণ। রিপোর্ট বলছে, তথ্যের অভাবে এবং সরকারি সহায়তা সহজে না পাওয়ায় অনেক পরিবার প্রতারিত হচ্ছে, অতিরিক্ত টাকা গুনতে হচ্ছে।

দূতাবাসে যোগাযোগ এবং সঠিক তথ্য পাওয়াও আরেকটি বড় সমস্যা। কোথায় কীভাবে আবেদন করতে হবে, কী কী কাগজ লাগবে, তার সঠিক ও সহজ তথ্য না থাকায় মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। এর প্রভাব শুধু ভিসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার, একীভূত হওয়া এবং পরিবারের মানসিক সুস্থতার ওপরও পড়ছে।

গবেষকরা বলছেন, ঝুঁকিতে থাকা অভিবাসী ও তাদের পরিবারকে রক্ষা করতে হলে নীতি আরও পরিষ্কার করতে হবে। তথ্য প্রচার সহজ করতে হবে এবং আনুষ্ঠানিক সহায়তা ব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করতে হবে। না হলে দালাল নির্ভরতা এবং ভোগান্তি কমবে না।

রিপোর্টে আর উল্লেখ করা হয়,  এত বেশি খরচ দিয়ে বিদেশে যাওয়ার কারণে রেমিট্যান্সের বড় একটি অংশই চলে যাচ্ছে ঋণ শোধ করতে। পরিবারের জীবনমান উন্নয়ন বা ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগের জন্য কিছুই থাকছে না। বিদেশে গিয়েও আর্থিক মুক্তি মিলছে না, বরং ঋণের বোঝা আরও বাড়ছে।

শুধু শুরুতে নয়, বিদেশে থাকার পরেও বৈধতা ধরে রাখতে লাগছে মোটা অঙ্কের টাকা। পারমিট নবায়ন, জরিমানা, কাগজপত্র ঠিক রাখতে প্রতিনিয়ত খরচ করতে হচ্ছে। রিপোর্টে গ্রিসে থাকা মিজান নামে এক তরুণ অভিবাসীর উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। ছয় মাসের একটি ডকুমেন্ট নবায়ন করতে তাকে ৬ হাজার ইউরো দিতে হয়েছে, যাতে পুলিশ রাস্তায় ধরলে ঝামেলা না করে।

মিজানের ভাষায়, ‘‘গত মাসে আমাকে এখানে ছয় মাসের জন্য একটি ডকুমেন্ট নবায়ন করতে হয়েছিল। এই ডকুমেন্ট থাকলে ভ্রমণের সময় পুলিশ কোনও ঝামেলা করে না। আমি সেই ডকুমেন্টের জন্য ফি দিয়েছি, প্রায় ৬০০০ ইউরো।’’

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইউরোপের দেশগুলোতে বাসা ভাড়াসহ জীবনযাত্রার ব্যয় অত্যন্ত বেশি। অন্যদিকে বেতন কম। ফলে মাস শেষে সঞ্চয় বা পরিবারকে টাকা পাঠানোর মতো কিছুই থাকে না অনেকের। কম বেতন ও উচ্চ খরচের এই চক্রে আটকা পড়ে আরও কঠিন হয়ে পড়ছে অভিবাসী পরিবারগুলোর জীবন।