শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে ঢাকা জেলায় শুরু হয়েছে ‘ক্লিন স্কুল টিম’ পাইলট প্রকল্প।
ঢাকা মহানগরের পাঁচটিসহ জেলার ১৬ উপজেলার মোট ২১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বুধবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে এই কার্যক্রম উদ্ধোধন করেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মিঞা।
জাপানের ‘ও-সোজি’ দর্শনের আলোকে বিদ্যালয়ের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও শ্রমের মর্যাদা গড়ে তোলা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে এ উদ্যােগ নিয়েছে ঢাকার জেলা প্রশাসন।
পরে ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মিঞা বলেন, ‘ও-সোজি মডেল শুধু পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার একটি কার্যকর উদ্যোগ। শিক্ষার্থীরা নিজের বিদ্যালয় নিজে পরিচ্ছন্ন রাখার অভ্যাস গড়ে তুললে তা তাদের পরিবার ও সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমরা চাই, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ মডেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হোক। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ জরুরি।’
মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মনিরুজ্জামান মিঞা বলেন, ‘আমার সন্তান কার সঙ্গে মিশছে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের ভাল কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হবে, খারাপ কাজের সঙ্গে না। আর আমাদের সামাজিক আন্দোলনগুলো স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করতে হবে। বাড়ি-ঘরকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। আমরা সচেতন থাকলে হাসপাতালে দৌড়াতে হবে না।’
জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতা শুধু বিদ্যালয় পরিষ্কার রাখার বিষয় নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, শ্রমের মর্যাদা ও পরিবেশের প্রতি যত্নশীল মনোভাব গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আজকের পরিচ্ছন্ন বিদ্যালয়ই আগামী দিনের সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির ভিত্তি।’
তিনি বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতা মূল্যবোধ বাড়ায়, ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনে। ছোট ছোট করে শুরু করলে মূল্যবোধটা তৈরি হবে। সবাই মিলে চেষ্টা চালালে সফলতার মুখ দেখবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেভাবে গ্রিন-ক্লিন বাংলাদেশ চাচ্ছেন, আমরা সেভাবে বাংলাদেশ গড়তে চাই।’
জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়, এ কর্মসূচির আওতায় প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, সাপ্তাহিক ডেঙ্গু ঝুঁকি পরিদর্শন, বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং শিক্ষার্থীদের বাসাভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা চর্চা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ঢাকার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানমের উদ্যোগে এ কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু বিদ্যালয় পরিষ্কার রাখা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা, দায়িত্ববোধ, শ্রমের মর্যাদা ও পরিবেশ সচেতনতার স্থায়ী অভ্যাস গড়ে তোলা। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে বিদ্যালয় থেকে পরিবার এবং পরিবার থেকে সমাজে পরিচ্ছন্নতার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম
বিদ্যালয়ের রুটিন অনুযায়ী প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। শিক্ষার্থীদের ছোট দলে ভাগ করে শ্রেণিকক্ষ, করিডোর ও পাঠাগারের মতো নিরাপদ স্থান পরিষ্কারের দায়িত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষকরা তদারকি করবেন এবং টয়লেট, নোংরা ড্রেন ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান পরিষ্কার করবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সাপ্তাহিক নজরদারি
প্রতি সপ্তাহে অন্তত এক দিন বিদ্যালয়ে ডেঙ্গু ঝুঁকি পরিদর্শন করা হবে। পানি জমার স্থান চিহ্নিত করা, পানির পাত্র ঢেকে রাখা এবং এডিস মশার প্রজননস্থল অপসারণে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ও সমস্যা সমাধানের অগ্রগতি চেকলিস্টে লিপিবদ্ধ করা হবে।
বাসায় পরিচ্ছন্নতার চর্চা
‘আমার বাসা, আমার দায়িত্ব’ কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা চেকলিস্ট দেওয়া হবে। এতে ঘর গুছিয়ে রাখা, বর্জ্য সঠিকভাবে ফেলা এবং বাড়ির আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়গুলো থাকবে। প্রতি রবিবার শিক্ষকরা চেকলিস্ট মূল্যায়ন করবেন।
বর্জ্য পৃথকীকরণ ও ব্যবহারিক শিক্ষা
বিদ্যালয়ে পচনশীল, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও অন্যান্য বর্জ্য আলাদা করে ফেলার ব্যবস্থা করা হবে। ডাস্টবিন ব্যবহারের পাশাপাশি পচনশীল বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরির বিষয়েও শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়া হবে।
‘ক্লিন স্কুল চ্যালেঞ্জ’ ও পুরস্কার
পরিচ্ছন্নতা, ডেঙ্গু প্রতিরোধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হবে। সেরা বিদ্যালয়, শ্রেণি ও শিক্ষার্থীদের সনদ, বই, শিক্ষা উপকরণ বা গাছের চারা দিয়ে পুরস্কৃত করার প্রস্তাব রয়েছে।
বলা হচ্ছে, ওসোজি মডেল শুধু পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নয়, এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার একটি কার্যকর উদ্যোগ। শিক্ষার্থীরা নিজের বিদ্যালয় নিজে পরিচ্ছন্ন রাখার অভ্যাস গড়ে তুললে তা তাদের পরিবার ও সমাজেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমরা চাই, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ মডেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত হোক। এ ক্ষেত্রে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ জরুরি।
গত ৮ জুলাই শিক্ষার্থীদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়া ও ডেঙ্গু প্রতিরোধে রাজধানীর সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘ক্লিন স্কুল টিম’ গঠন করে ঢাকা জেলা প্রশাসন। ক্লিন স্কুল টিম গঠনের পর প্রায় ৩ মাস গবেষণা, বিদ্যালয় গুলোর কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ উপযোগী জাপানিজ স্কুলের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার মডেল ওসোজির আদলে ক্লিন স্কুল টিমের বাস্তবায়ন পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে।