এক এলাকায় একইদিনে দুইবার উচ্ছেদ অভিযান চালালো ডিএনসিসি

রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর এলাকায় একই দিনে দুই দফায় ফুটপাত উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত প্রথম দফা অভিযান চালানোর এক ঘণ্টার মধ্যেই আবার ফুটপাতে দোকান বসানোর প্রস্তুতি নেন হকাররা। পরে সন্ধ্যা ৬টার দিকে দ্বিতীয় দফায় অভিযান শুরু করেন ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।

এ সময় তিনি বলেন, ‘আমরা মিরপুর ১ নম্বরকে মিরপুর ১০ নম্বরের মতো বানাতে চাই। সে জন্য যদি আরও দুই-চার দিন কষ্ট করতে হয়, আমি সেই কাজ করার জন্য প্রস্তুত আছি।’

বুধবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সনি হলের সামনে থেকে দ্বিতীয় দফার অভিযান শুরু হয়। এ সময় প্রশাসকের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেট, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। অভিযানের সময় নেতাকর্মীদের স্লোগান দিতে দেখা যায়।

উচ্ছেদ অভিযানে ডিএসসিসি প্রশাসক। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

অভিযানকারীরা হযরত শাহ আলী শপিং কমপ্লেক্সের সামনে পৌঁছে নতুন করে ফুটপাতে বসানো দোকান ভাঙচুর করেন। এ সময় দলীয় নেতাকর্মীদেরই দোকান ভাঙচুর করতে দেখা যায়। পরে মিরপুর-১ নম্বর কাঁচাবাজারের পাশের সড়কে বসানো দোকানেও অভিযান চালানো হয়। এরপর ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ফুটপাত দখল করে রাখা মালামাল ডিএনসিসির ট্রাকে তুলে নেওয়া হয়। এসব মালামালের মধ্যে আলু, পেঁয়াজ ও রসুনের মতো পণ্যও ছিল। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ডিএনসিসির কর্মীদের অভিযান চালাতে দেখা যায়।

এর আগে বুধবার সকালে চালানো অভিযানে কয়েকশো দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে অভিযান শেষ হওয়ার এক ঘণ্টার মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধা সুপার মার্কেট ও হযরত শাহ আলী শপিং কমপ্লেক্সের সামনের ফুটপাতে আবার দোকান বসাতে দেখা যায় হকারদের। এ সময় মুক্তিযোদ্ধা সুপার মার্কেট কর্তৃপক্ষ মাইকিং করে জানায়, ‘মার্কেটের সামনে দোকান বসা নিষেধ। যাদের আছে এখন তারা সরিয়ে ফেলুন।’

দুপুর পৌনে ৩টার দিকে ডিএনসিসির অঞ্চল-২-এর একটি গাড়ি এসে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা কাঠ, বাঁশ, ইটসহ দোকান বসানোর বিভিন্ন সরঞ্জাম ট্রাকে তুলে নেয়। এ সময় কয়েকজনের দোকান সরিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদের দোকান সরিয়ে নিতে বলা হলে হকাররা নিজেরাই সেগুলো সরিয়ে নেন। পরে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা রাস্তা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করেন।

ডিএনসিসির অঞ্চল-২-এর পরিদর্শক জহুরুল আলম সুজন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের এখন অভিযান চলমান থাকবে। কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই, যেকোনো সময় আমরা আসবো। আমাদের এখনও আরও দুটি দল আছে। আমরা চলে গেলেও তারা যেকোনো সময় এসে দেখবে।’

ডিএসসিসির অভিযান। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

‘একই জায়গায় একইভাবে মালামাল রেখে গেছেন’

সন্ধ্যার অভিযান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। তিনি বলেন, সকাল ১১টার দিকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছিল। তখন মানবিক কারণে কিছু দোকানদার তাঁর কাছে সময় চেয়েছিলেন। সন্ধ্যার মধ্যে দোকান পরিষ্কার করে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার শর্তে তাঁদের সময় দেওয়া হয়েছিল।

শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘সেসময় মানবিক কারণে কিছু দোকানদার আমাদের কাছে সময় চেয়েছিলেন। আমরা তাদের বলেছিলাম, সন্ধ্যার মধ্যে দোকানগুলো পরিষ্কার করে মালামাল সরিয়ে নিতে হবে। তারাও আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সন্ধ্যার মধ্যে মালামাল সরিয়ে জায়গাগুলো পরিষ্কার করে দেবেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আমরা জানতে পারি, দোকানদার ভাইয়েরা তাদের সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারেননি। একই জায়গায় একইভাবে মালামাল রেখে গেছেন।’

তিনি বলেন, ‘এই সংবাদ পাওয়ার পর আমরা আবার এখানে এসেছি। কিন্তু এখন তাদের খুঁজে পাচ্ছি না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছি। কারণ, বারবার তারা একই কাজ করবেন—কোনও বিশেষ শক্তির কারণে, নাকি কোনও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায়—সেটি আমাদের এখন খুঁজে বের করতে হবে।’

অভিযান ব্যাহত করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে অভিযোগ করে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, নগর উন্নয়নের জন্য ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ রাখার পরিকল্পনা অনুযায়ী অভিযান অব্যাহত থাকবে। তাঁর দাবি, সরকারকে বিব্রত করতে ষড়যন্ত্রকারীরা পেছন থেকে পৃষ্ঠপোষকতা ও উসকানি দিচ্ছে।

ডিএসসিসির অভিযান। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

তিনি বলেন, ‘আগামীকাল থেকে যদি কেউ আবার এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করে, পুলিশের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করবেন এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।’

হকারদের পুনর্বাসনের দাবি

সকালের অভিযানে দোকান হারানো এক ব্যবসায়ী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার মার্কেটের সামনে ফুটপাতে কসমেটিকসের দোকান ছিল। উঠিয়ে দিয়েছে। এখন টেনশন কাজ করছে, এভাবে যদি এক-দুই মাস আমাদের বসতে না দেয়, তাহলে সংসার কীভাবে চালাবো।’

আলাদা জায়গায় পুনর্বাসন করা হলে সেখানে যাবেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাধারণত তারা এমন জায়গায় আমাদের পাঠায়, সেখানে কাস্টমার যায় না। এখানে মানুষ মার্কেটে কেনাকাটা করতে এসে চোখের সামনে পড়লে আমাদের থেকে কিছু কিনে নেয়। ওখানে গেলে তো আর সেটা হবে না। যদি কেউ শুধু ফুটপাত থেকে কিনতে চায়, তারা তখন ওদিকে গেলেও যেতে পারে।’

হযরত শাহ আলী শপিং কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী রিপন খান বলেন, ‘এদের একদিকে উঠিয়ে দিলে আরেক দিকে আবার বসে যায়। প্রশাসন চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ওরা আবার বসে যায়। ওদের চাইলে সরকার একটা জায়গা নির্ধারণ করে দিতে পারে মাজারের পেছনে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, ওরা তাও রাস্তায়ই বসবে, এটা ওদের অভ্যাস।’

ডিএসসিসির অভিযান। ছবি: বাংলা ট্রিবিউন

‘প্রতিটি জায়গার ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে’

এর আগে দুপুর ১টার দিকে প্রথম দফার অভিযান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডিএনসিসির প্রশাসক। তিনি বলেন, ‘আজ শুধু ফুটপাত উচ্ছেদের অভিযান নয়। আমি বারবার বলেছি, ঢাকা শহরের যেসব জায়গায় এ ধরনের জঞ্জাল রয়েছে এবং যেগুলো আমার প্রিয় নগরবাসীর হাঁটাচলায় বাধা সৃষ্টি করছে, প্রতিটি জায়গায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে। প্রতিটি জায়গার ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে আমার কাছে মনে হয়েছে, জনগণের হাঁটাচলার রাস্তা তাঁদের বুঝিয়ে দেওয়া আমার নৈতিক দায়িত্ব। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছি, এর আশপাশে অনেকগুলো মার্কেট রয়েছে। এসব মার্কেটের অনেক কমিটির নেতারা এবং সাধারণ জনগণ ব্যক্তিগতভাবে আমাকে এ বিষয়ে বহুবার অভিযোগ করেছেন।’

ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, ‘আমি বারবার বলেছি, যত দিন দায়িত্ব পালন করব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ক্লিন ঢাকা, গ্রিন ঢাকা নির্মাণের অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করবো। আমি ঢাকা শহরকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ করতে চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা কথায় বলবেন, কিন্তু কাজের সময় থাকবেন না; পেছনে গিয়ে অবৈধ ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করবেন—সেটি তো হতে দেওয়া যায় না। তাই আজ থেকে মিরপুর ১ নম্বরে যে অভিযান শুরু করেছি, তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা এখানে থাকব। এখানকার পরিবেশ ক্লিন করব, গ্রিন করব।’