ঢাকায় মাক্ রিবুর একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী

আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে বিশ্বখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী মাক্ রিবুর ‘বাংলাদেশ ১৯৭১: শোক ও সকাল’ শীর্ষক একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। শুক্রবার (১৪ অক্টোবর) শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন।

এছাড়াও অনুষ্ঠানে ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপিয়ান উনিয়নের চার্জ ডি অ্যাফেয়ার্স ব্যার্ন্ড স্প্যানিয়ের এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ফরাসি দূতাবাসের চার্জ ডি অ্যাফেয়ার্স গিয়ম অড্রেন দে কেরড্রেল। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

শুক্রবার শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী চলবে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। সোমবার থেকে শনিবার বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রদর্শনী খোলা থাকবে। রবিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত। ‘লা’ সেসিও লেসামি দ্য মাক্ রিবু’ এবং গিমে মিউজিয়ামের সহযোগিতায় আয়োজিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে তোলা আলোকচিত্র নিয়ে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। প্রদর্শনীটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। যৌথভাবে এর কিউরেটিং করেছেন মফিদুল হক এবং লরেন ড্রুরে।

১৯২৩ সালে ফরাসি আলোকচিত্রশিল্পী মাক্ রিবুর জন্ম। ২০১৬ সালে ৯৩ বছর বয়সে প্যারিসে তিনি মারা যান। ১৯৩৭ সালে তিনি প্রথম ছবি তুলেছিলেন প্যারিসে আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী এক্সপোজিসিও ইউনিভেখসেলে। নিজের ১৪তম জন্মদিন উপলক্ষে বাবার দেওয়া উপহার ছোট্ট ভেস্ট পকেট কোডাক ক্যামেরা দিয়ে তিনি সেসব ছবি তোলেন। ১৯৪৪ সালে তিনি হানাদার নাজি বাহিনীর বিরুদ্ধে ভেখকোর প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত তিনি লিঁও’র ইকোল সন্থ্রালে প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা করেন। তারপর কাজ শুরু করেন। যদিও তিন বছর পরই পেশা পরিবর্তন করে তিনি একজন আলোকচিত্রী হওহার সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৫৩ সালে তার তোলা আইফেল টাওয়ারের ওপর কাজে ব্যস্ত একজন রঙমিস্ত্রির ছবি লাইফ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। এটাই ছিল তার প্রথম প্রকাশিত আলোকচিত্র। তারপর হেনরি কাখতিয়ের-ব্রেসন এবং রবার্ট কাপার আমন্ত্রণে তিনি ম্যাগনাম ফটোতে যোগ দেন।

১৯৫৫ সালে তিনি সড়কপথে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আফগানিস্তান হয়ে ভারতে পরিভ্রমণ করেন। সেখানে তিনি এক বছরের বেশি অবস্থান করেন। ১৯৫৭ সালে তিনি কলকাতা থেকে প্রথমবারের মতো বেইজিং যান, যেখানে পরেও আরও বহুবার অবস্থান করেছেন তিনি।

সোভিয়েত ইউনিয়নে তিন মাসের প্রবাসজীবন শেষে ১৯৬০ সালে তিনি আলজেরিয়া ও সাব-সাহারা আফ্রিকার স্বাধীনতা আন্দোলনের ছবি তোলেন। ১৯৬৮ এবং ১৯৭৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তিনিই ছিলেন সেই স্বল্প কয়েকজন ব্যক্তির অন্যতম যারা যুগপৎ উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামে ছবি তোলার অনুমতি পেয়েছিলেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদে পেন্টাগনের সামনে আন্দোলন চলাকালীন সময়ে তার তোলা ‘ফুল হাতে একজন তরুণী’র ছবি শান্তির আন্তর্জাতিক প্রতীকে পরিণত হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তিনি ১৯৭১ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে কলকাতায় আসেন। তিনি শরণার্থী শিবির এবং মুক্তা লে ঘুরে  দেখেন। ৩ ডিসেম্বরে যখন ভারত-পাকিস্তান সর্বতোভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থিত অগ্রসরমান ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। তার অভিযাত্রা শুরু হয় জামালপুর-শেরপুর থেকে। তারপর ব্রহ্মপুত্র নদ পার হয়ে তিনি প্রত্যক্ষ করেন জামালপুরের বিজয়সূচক যুদ্ধ, যা তিনি বিস্তৃতভাবে ক্যামেরাবন্দী করেন। তিনি ছিলেন প্রথম সাংবাদিকদের অন্যতম, যারা ঢাকায় প্রবেশ করে এই নগরীর মুক্তিকে ক্যামেরায় ধারন করেছেন। এসব ছবির অধিকাংশই আজ পর্যন্ত অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।

১৯৮০ ও ৯০-এর দশকে, তিনি প্রায়ই ফিরে যেতেন প্রাচ্যে এবং দূরপ্রাচ্যে, বিশেষ করে অ্যাংকর এবং হুয়াং-শানে, কিন্তু তিনি চীনের দ্রুত এবং গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরগুলোও অবলোকন করেছেন ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। ২০১১ সালে মাক্ রিবু ১৯৫৩ হতে ১৯৭৭ সালের ভেতর তার ধারন করা ১৯২টি আলোকচিত্রের মূলপ্রিন্ট প্যারিসের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টকে (সেন্টার জর্জ পম্পেদু) দান করেন। তার আলোকচিত্র অনেক মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা অর্জন করেছে এবং অন্যান্য অনেক জায়গার মতোই প্যারিস, নিউ ইয়র্ক, সাংহাই এবং টোকিওর জাদুঘর ও গ্যালারিগুলোতে প্রদর্শিত হয়েছে।