রাজধানীর আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন অন্তরা ইসলাম। পাশেই যাত্রীছাউনি। এরপরও সড়কের ওপরেই দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছিলো তাকে। অন্তরার অভিযোগ, যাত্রীছাউনিতে চায়ের দোকান থাকায় সেখানে বসার পরিবেশ নেই। তাই বাধ্য হয়ে সড়কের পাশেই দাঁড়াতে হচ্ছে।
শুধু আজিমপুরেই নয়, রাজধানীজুড়ে যাত্রীছাউনিগুলোর বেশির ভাগই হকার ও ফুটপাতের দোকানিদের দখলে। কোথাও কোথাও আবার দখল করে নিয়েছে বিভিন্ন গণপরিবহনের টিকিট বিক্রেতারা। পল্টন মোড়ে দারুস সালাম মার্কেটের সামনে যাত্রীছাউনি দখল করে বসানো হয়েছে বইপুস্তকের দোকান। দোয়েল চত্বরে শিশু একাডেমির সামনের যাত্রীছাউনির একাংশ দখল করে বসানো হয়েছে চায়ের দোকান। গত কয়েক দিনে রাজধানীর ধানমন্ডি, মিরপুর সড়ক, বাংলামোটর, শাহবাগ, প্রেসক্লাব এলাকা ঘুরে দেখা যায় এমন চিত্র। বেশির ভাগ ছাউনিই ফাস্টফুড, কনফেকশনারি, চা-পান-সিগারেট, ফ্লেক্সিলোডের দোকানের দখলে। আবার ছাউনিগুলোর সামনে বাস দাঁড়ানোর কথা থাকলেও কোনও বাসই এখানে দাঁড়ায় না। এ কারণে বিপুল অঙ্কের টাকা খরচ করে নির্মাণ করা এসব যাত্রীছাউনি যাত্রীদের কোনও কাজেই আসছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) প্রকল্পের অধীনে রাজধানীতে যাত্রীসেবা বৃদ্ধি ও গণপরিবহনের নৈরাজ্য ঠেকাতে রাস্তার পাশে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নির্দেশিত স্থানে ঢাকা দক্ষিণে ৭০টি ও উত্তরে ৬০টি যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা ছাউনি রয়েছে ৫০টিরও বেশি।
ভুক্তভোগী যাত্রীরা বলছেন, দখলদারদের জন্য তারা এর সুফল পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মূলত যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং সড়কের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সরকারি সংস্থাগুলো আন্তরিক নয়। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রভাবশালীরাও এসব যাত্রীছাউনি দখলের সঙ্গে জড়িত।’
তিনি আরও বলেন, ‘যাত্রীছাউনিতে তো শুধু বাসের যাত্রীরা অপেক্ষা করেন না। অনেক দূর থেকে আসা পথচারীরাও বিশ্রাম নেন। এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে সিটি করপোরেশনসহ সরকারি সংস্থাগুলোকে আরও বেশি জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে।’
আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাত্রীছাউনিগুলো নির্মাণের সময়ই অনেক অনিয়ম হয়েছে। তবে মোটাদাগে কর্তৃপক্ষের অবহেলা এবং নজরদারির অভাবেই মূলত এগুলো বেদখল হয়ে যাচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, কেইস প্রকল্পের অধীনে ছাউনিগুলো নির্মাণের সময় সঠিক পরিকল্পনা ছিল না। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে বাস স্টপেজ নাই এমন জায়গাতেও যাত্রীছাউনি হয়েছে। ফলে সেগুলো বেদখল হয়ে গেছে। এখনও সঠিকভাবে নজরদারি করলে এগুলো থেকে যাত্রীরা সুফল পেতে পারেন।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনের যাত্রীছাউনিতে দোকান করছিলেন আবদুল জলিল। কীভাবে যাত্রীছাউনি দখল করে এই দোকান করছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সব যায়গা ম্যানেজ করেই এখানে দোকান করতে হয়।’
কীভাবে ম্যানেজ করেন বা কাকে ম্যানেজ করেন, জানতে চাইলে আর কথা বলতে রাজি হননি তিনি। সব ছাউনিতে দোকান করা দোকানিরাই আবদুল জলিলের মতো কারও নাম বলতে রাজি হন না।
এদিকে যাত্রীছাউনিগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) বলছে, তারা নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালালেও কয়েকদিনেই আবার বেদখল হয়ে যায় ছাউনিগুলো।
ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী সালেহ আহম্মেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মানুষের সুবিধার জন্য যাত্রীছাউনিগুলো আমরা খুব সুন্দর করে একটু বড় পরিসরে বানিয়েছি। কিন্তু দখলদারদের বার বার উচ্ছেদ করার পরও আবার এসে তারা দখল করে। তাদের সঙ্গে কত আর ইঁদুর-বিড়াল খেলা যায়!’